রোজা কীভাবে শরীরের ‘প্রদাহ’ নিরাময় করে

· Prothom Alo

সাম্প্রতিক সময়ে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক পুষ্টিবিজ্ঞানীরা স্বীকার করছেন, রোজা শরীরের অভ্যন্তরীণ দীর্ঘমেয়াদী প্রদাহ (ইনফ্লেমেশন) নিরাময়ের এক শক্তিশালী বায়োটেকনোলজি।

পবিত্র কোরআনে বর্ণিত মারিয়াম (আ.)-এর মৌনব্রত থেকে শুরু করে রমজানের সাহ্‌রি-ইফতার—সবই এই নিরাময় প্রক্রিয়ার ভিন্ন ভিন্ন রূপ।

Visit chickenroad-game.rodeo for more information.

রোজার ভাষাগত প্রেক্ষাপট

রোজার আরবি ‘সওম’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো ‘ইমসাক’ বা কোনো কিছু থেকে বিরত থাকা। পারিভাষিক অর্থে সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও পাপাচার থেকে বিরত থাকাকে রোজা বলা হয়।

তবে ইতিহাসের পাতায় রোজার ধারণা আরও বিস্তৃত।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ–তাআলা মারিয়াম (আ.)-এর প্রসঙ্গে বলেছেন, “অতঃপর যদি তুমি কোনো মানুষকে দেখ, তবে বলবে—আমি দয়াময় আল্লাহর উদ্দেশ্যে রোজা মানত করেছি; সুতরাং আজ আমি কোনো মানুষের সঙ্গে কথা বলব না।” (সুরা মারিয়াম, আয়াত: ২৬)

এখানে পানাহারের পাশাপাশি কথা বলা থেকেও বিরত থাকাকে ‘সওম’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।

রোজা : কোরআন যেভাবে সংযমের শিক্ষা দেয়
গবেষণায় দেখা গেছে, রমজানের ২৯ দিন রোজা রাখার ফলে বিপাকীয় সিনড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের রক্তে প্রদাহের সংকেত কমে গেছে এবং কোষ সুরক্ষা প্রদানকারী প্রোটিনের মাত্রা বেড়েছে।

বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে দীর্ঘমেয়াদী প্রদাহ

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘ইনফ্লামেশন’ বা প্রদাহ হলো শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার একটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। কিন্তু যখন এই প্রদাহ দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয়, তখন তা শরীরের সুস্থ কোষগুলোকে ধ্বংস করতে শুরু করে।

স্থূলতা, মানসিক চাপ এবং অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাসের ফলে রক্তে শর্করার পরিমাণ বেড়ে যায়, যা শরীরকে সবসময় একটি ‘জরুরি অবস্থার’ মধ্যে রাখে। ফলে কোষের শক্তি উৎপাদনকারী কেন্দ্র ‘মাইটোকন্ড্রিয়া’ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং কোষের স্বাভাবিক বর্জ্য নিষ্কাশন প্রক্রিয়া বা ‘অটোফ্যাজি’ থমকে যায়।

২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সেল’ (Cell) জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, উপবাস বা রোজা রাখার ফলে শরীরে প্রদাহ সৃষ্টিকারী উপাদানের মাত্রা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পায়।

গবেষকরা ২১ জন স্বেচ্ছাসেবীর ওপর পরীক্ষা চালিয়ে দেখেন যে, ২৪ ঘণ্টা উপবাসের পর রক্তে ‘অ্যারাকিডোনিক অ্যাসিড’ নামক এক প্রকার চর্বি বৃদ্ধি পায়, যা শরীরের প্রদাহ সৃষ্টিকারী ‘NLRP3 ইনফ্লামাসোম’ নামক প্রোটিনের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়।

উপবাসের বিভিন্ন পদ্ধতি

বর্তমানে বিশ্বে উপবাসের বেশ কিছু জনপ্রিয় পদ্ধতি প্রচলিত রয়েছে, যার প্রতিটির ওপর বিজ্ঞানীরা নিবিড় গবেষণা চালাচ্ছেন:

১. ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং: এতে সাধারণত ১৬ ঘণ্টা উপবাস এবং ৮ ঘণ্টা খাওয়ার সুযোগ থাকে। ‘দ্য জার্নাল অফ নিউট্রিশন’-এ প্রকাশিত ৮০টিরও বেশি গবেষণার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এই পদ্ধতি ইনসুলিন সেনসিটিভিটি বাড়াতে এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে জাদুর মতো কাজ করে।

রোজা অটোফ্যাজি নয়: জানুন উভয়ের মিল–অমিলডক্টর মার্ক ম্যাটসন, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অন এজিং (এনআইএ)-এর নিউরোসায়েন্স ল্যাবের প্রধানউপবাস কেবল শরীরের ওপর নয়, বরং মস্তিষ্কের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। এটি মস্তিষ্কের কোষগুলোকে মানসিক চাপের বিরুদ্ধে লড়তে সাহায্য করে।

২. ওয়াটার ফাস্টিং: এ পদ্ধতিতে কেবল পানি পান করে ২৪ ঘণ্টা থেকে কয়েক দিন পর্যন্ত থাকা হয়। ‘ক্লিনিক্যাল অ্যান্ড ট্রান্সলেশনাল মেডিসিন’ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ৪৮ জন সুস্থ ব্যক্তির ওপর ৫ দিনের ওয়াটার ফাস্টিং প্রয়োগ করে দেখা গেছে, তাদের রক্তচাপ ও ওজন দ্রুত হ্রাস পেয়েছে। তবে এতে পেশির ক্ষয় হওয়ার ঝুঁকি থাকে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।

৩. ড্রাই ফাস্টিং: এটাই মুসলিমদের রোজা এবং উপবাসের সবচেয়ে কঠিন ও ফলপ্রসূ রূপ, যেখানে খাবার ও পানি উভয়ই ত্যাগ করা হয়।

যদিও এ বিষয়ে গবেষণার সংখ্যা তুলনামূলক কম, তবে ‘এলসেভিয়ার’ নামক বৈজ্ঞানিক সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, রমজানের ২৯ দিন রোজা রাখার ফলে বিপাকীয় সিনড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের রক্তে প্রদাহের সংকেত কমে গেছে এবং কোষ সুরক্ষা প্রদানকারী প্রোটিনের মাত্রা বেড়েছে।

আল্লাহর রাসুল (সা.) এই পদ্ধতির উপকারিতা সম্পর্কে বহু আগে আমাদের সচেতন করেছেন। হাদিসে এসেছে, “তোমরা রোজা রাখো, সুস্থ থাকবে।” (তাবারানি, আল-মুজামুল আওসাত, হাদিস: ৮৩১২)

বিশেষজ্ঞদের অভিমত

যুক্তরাষ্ট্রের অরল্যান্ডো হেলথ হাসপাতালের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডক্টর প্রদীপ জামনদাস মনে করেন, উপবাস শরীরকে ‘সঞ্চয় মোড’ থেকে ‘মেরামত মোড’-এ নিয়ে যায়। যখন আমরা বারবার খাই, শরীর তখন কেবল শক্তি সঞ্চয় করতে ব্যস্ত থাকে।

কিন্তু যখন আমরা উপবাস করি, তখন ইনসুলিনের মাত্রা কমে যায় এবং শরীর তার অভ্যন্তরীণ জঞ্জাল পরিষ্কার করতে শুরু করে।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অন এজিং (এনআইএ)-এর নিউরোসায়েন্স ল্যাবের প্রধান ডক্টর মার্ক ম্যাটসন দেখিয়েছেন, উপবাস কেবল শরীরের ওপর নয়, বরং মস্তিষ্কের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। এটি মস্তিষ্কের কোষগুলোকে মানসিক চাপের বিরুদ্ধে লড়তে সাহায্য করে।

তবে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টর ভাল্টার লংগো সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদী উপবাস বা ‘থেরাপিউটিক ফাস্টিং’ অবশ্যই চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে হওয়া উচিত, বিশেষ করে যারা আগে থেকেই কোনো রোগে আক্রান্ত।

সূত্র: আল–জাজিরা ডট নেট

রোজা রেখে নাক, কান ও গলা রোগের চিকিৎসায় যা করণীয়

Read full story at source