মজুত তেল বাজারে ছাড়বে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা, তেলের দাম ৯০ ডলারের নিচে
· Prothom Alo

ইরানকে ঘিরে যুদ্ধের কারণে তেলের সরবরাহে যে বিঘ্ন ঘটছে, তা সামাল দিতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) ইতিহাসের সবচেয়ে বড় তেলের চালান বাজারে ছাড়ার প্রস্তাব দিয়েছে—এমন খবর প্রকাশের পর আজ বুধবার তেলের দাম ওঠানামা করছে।
Visit rocore.sbs for more information.
এ প্রতিবেদন লেখার সময় স্পট মার্কেটে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ২৮ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ২৮ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ৮৮ দশমিক শূন্য ৮ ডলার। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম ৩৭ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৪৪ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৩ দশমিক ৮২ ডলার হয়েছে। খবর রয়টার্সের
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানায়, ইরানের যুদ্ধজনিত সরবরাহের সংকট মোকাবিলায় আইইএ যে মজুত তেল বাজারে ছাড়ার প্রস্তাব দিয়েছে, তা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর যে তেল তারা বাজারে ছেড়েছিল, তার চেয়ে বেশি। ২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরু করার পর দুই দফায় সদস্যদেশগুলো যে ১৮ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল তেল বাজারে ছেড়েছিল, এবার তার চেয়েও বেশি তেল বাজারে ছাড়া হতে পারে। এ বিষয়ে অবগত কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য আইইএ বা যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউস রয়টার্সের অনুরোধে তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি।
মঙ্গলবার ব্রেন্ট ক্রুড ও ডব্লিউটিই ক্রুডের দাম ১১ শতাংশের বেশি পড়ে যায়; ২০২২ সালের পর এক দিনে এটি সবচেয়ে বড় পতন। এর আগের দিন ট্রাম্প দ্রুত যুদ্ধ শেষ হওয়ার পূর্বাভাস দেন। সোমবার অবশ্য একপর্যায়ে দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৯ ডলারের বেশি হয়েছিল, ২০২২ সালের জুনের পর এটি ছিল তেলের সর্বোচ্চ দাম।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ করলে চরম পরিণতি বরণ করতে হবে—ইরানের প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের এমন হুমকির পর মঙ্গলবার বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমে যায়। সেই সঙ্গে ট্রাম্প বলেছেন, ইরান যুদ্ধ শিগগিরই শেষ হবে। এখন তার সঙ্গে যুক্ত হলো আইইএর তেল ছাড়ার ঘোষণা। সব মিলিয়ে তেলের দাম দ্রুতই কমে গেছে, যদিও চলতি বছরের শুরুর তুলনায় তা বেশি।
এদিকে মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে তীব্র বিমান হামলা চালায়। পেন্টাগন ও ঘটনাস্থলে থাকা ইরানিরা এটিকে চলমান যুদ্ধের সবচেয়ে তীব্র আক্রমণ বলে উল্লেখ করেছে।
এদিন হরমুজ প্রণালিতে মাইন পেতে রাখার জন্য ইরান যে ১৬টি নৌযান পাঠিয়েছিল, তা ধ্বংস করা হয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড। একই সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, ইরান যদি প্রণালিতে কোনো মাইন পেতে থাকে, তা অবিলম্বে সরিয়ে ফেলতে হবে।
ট্রাম্প একাধিকবার বলেছেন, প্রয়োজন হলে হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে তেলবাহী ট্যাংকার চলাচলে যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তাসহায়তা দেবে। তবে সূত্রগুলো জানিয়েছে, ঝুঁকি খুব বেশি হওয়ায় আপাতত জাহাজ কোম্পানিগুলোর সামরিক পাহারার অনুরোধ নৌবাহিনী নাকচ করেছে।
সিডনিভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান আইজির বাজার বিশ্লেষক টনি সাইকামোর এক নোটে বলেন, তথ্যপ্রবাহের প্রভাবে আগামী দিনগুলোতে তেলের দাম অত্যন্ত অস্থির থাকবে। সম্ভবত ব্যারেলপ্রতি ৭৫ থেকে ১০৫ ডলারের মধ্যে তেলের দাম ওঠানামা করবে।
এদিকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি তেল মজুত বাজারে ছাড়ার সম্ভাবনা নিয়ে জি-৭ দেশের কর্মকর্তারা অনলাইনে বৈঠক করেছেন। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ জি-৭ দেশের নেতাদের নিয়ে ভিডিও কলে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে জ্বালানিবাজারে প্রভাব এবং পরিস্থিতি মোকাবিলার উপায় নিয়ে আলোচনা করবেন।
এদিকে ড্রোন হামলার পর স্থাপনার একটি অংশে আগুন লাগায় আবুধাবিভিত্তিক তেল কোম্পানি অ্যাডনক রুয়াইস শোধনাগার বন্ধ করে দিয়েছে। চলমান যুদ্ধে একের পর এক তেল শোধনাগারে হামলা হচ্ছে। এটি তার সর্বশেষ নজির।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরব লোহিত সাগরপথে সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। তবে জাহাজ চলাচলের তথ্য বলছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে সরবরাহ কমে যাওয়ায় যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা পূরণে এই সরবরাহ এখন যথেষ্ট নয়।
ইরান যুদ্ধের কারণে প্রতিবেশী ইরাক, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ইতিমধ্যে উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। ফলে উৎপাদনে বড় কাটছাঁট এড়াতে সৌদি আরব লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরের ওপর নির্ভর করে রপ্তানি বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
জ্বালানি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান উড ম্যাকেঞ্জি জানিয়েছে, এই যুদ্ধের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেল তেল ও তেলজাত পণ্যের সরবরাহ কমে যাচ্ছে। এতে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে।
অন্যদিকে মরগ্যান স্ট্যানলি এক নোটে বলেছে, যুদ্ধ দ্রুত শেষ হলেও জ্বালানিবাজারে বিঘ্ন আরও কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে।
উচ্চ চাহিদার কারণে গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে অপরিশোধিত তেল, পেট্রল ও ডিস্টিলেট জ্বালানির মজুত কমেছে বলে বাজার সূত্র জানিয়েছে। তারা মঙ্গলবার প্রকাশিত আমেরিকান পেট্রোলিয়াম ইনস্টিটিউটের উদ্ধৃতি দিয়ে এ তথ্য দিয়েছে।
বাড়তি ব্যয় ভোক্তার ঘাড়েই চাপবে
তেল পরিবহনকারী জাহাজ হরমজু প্রণালি এড়িয়ে চলছে। ফলে ইরান যুদ্ধের কারণে জাহাজ পরিবহনের খরচ বেড়েছে। সেই বাড়তি ব্যয় শেষমেশ ভোক্তাদের ওপরই চাপানো হবে—বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিপিং কোম্পানির প্রধান বিবিসিকে এ কথা বলেছেন।
ডেনমার্কভিত্তিক শিপিং কোম্পানি মেয়ার্সকের প্রধান নির্বাহী ভিনসেন্ট ক্লার্ক একান্ত সাক্ষাৎকারে বিবিসিকে বলেন, ‘আমাদের প্রচলিত চুক্তিকাঠামোর মধ্যেই এমন ব্যবস্থা আছে। অর্থাৎ জ্বালানির দাম বাড়ুক বা কমুক, তা গ্রাহকদের ওপর চাপিয়েই সমন্বয় করা হয়।’
ভিনসেন্ট ক্লার্ক আরও বলেন, ‘এর মানে হলো, বর্তমান পরিস্থিতিতে পরিবহন ব্যয় যতটা বাড়বে, তা শেষ পর্যন্ত গ্রাহকদের ওপর পড়বে এবং সেখান থেকে তা ভোক্তাদের কাঁধেই চাপবে।’
ডেনমার্কের কোম্পানিটির মূল ব্যবসা কনটেইনার পরিবহন। বিশ্বজুড়ে খেলনা, পোশাক, ইলেকট্রনিক পণ্যসহ বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য পরিবহনে তাদের কনটেইনার শিপিং আস্থার জায়গা করে নিতে পেরেছে।