৪ হাজার কোটি টাকায় কেনা ইভিএম এখন গলার কাঁটা

· Prothom Alo

মেয়াদ শেষ, যন্ত্রগুলো আর নির্বাচনেও কাজে লাগবে না। মামলা থাকায় পুড়ে ফেলতেও পারছে না ইসি। প্রতি মাসে গুদামভাড়া দিতে হচ্ছে।

২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় কেনা দেড় লাখ ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) নির্বাচন কমিশনের কাছে এখন বোঝা। প্রায় চার হাজার কোটি টাকায় কেনা এসব যন্ত্র ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

Visit saltysenoritaaz.com for more information.

মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় ইভিএমগুলো পুড়ে ফেলতে (ডিসপোজার) চায় নির্বাচন কমিশন (ইসি), কিন্তু এখন পোড়াতেও পারছে না। কারণ, ইভিএম কেনাকাটায় দুর্নীতির অভিযোগ থাকায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্ত চলছে। মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের নিরীক্ষা (অডিট) আপত্তি রয়েছে। যন্ত্রগুলো পুড়লে নতুন ঝামেলায় পড়তে হতে পারে ভেবে ইসি সিদ্ধান্ত দিতে পারছে না। তা ছাড়া এগুলো পোড়াতে হলে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নিতে হবে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, ইভিএম যন্ত্রে ব্যাটারি, সার্কিট বোর্ড, মেমরি চিপ থাকে। উন্মুক্ত পরিবেশে এগুলো পোড়ালে বায়ুদূষণ হয়, যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। এসব যন্ত্র ল্যান্ডফিলে না ফেলে যত্রতত্র ফেললে মাটি দূষিত হয়। তবে এগুলো পোড়ানোর বিষয়ে তাঁদের কাছে কোনো আবেদন জমা পড়েনি বলে জানান তিনি।

এদিকে যন্ত্রগুলো বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির (বিএমটিএফ) ওয়্যারহাউস এবং বিভিন্ন জেলায় গুদামে রাখায় প্রতি মাসে ভাড়া দিতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তড়িঘড়ি করে পরিকল্পনা ছাড়া বেশি দামে দেড় লাখ ইভিএম কেনা হয়েছিল। এখন যার খেসারত দিতে হচ্ছে। তাঁরা বলছেন, একদিকে টাকার অপচয়, অন্যদিকে ইভিএমগুলো কাজেও লাগছে না। উল্টো প্রতি মাসে কোটি টাকার বেশি ভাড়া দিতে হচ্ছে। এই টাকা গচ্চা দিতে হচ্ছে নিবাচন কমিশনকে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ২০২৪ সালের নভেম্বরে এ এম এম নাসির উদ্দীন নতুন প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব পাওয়ার পর পড়ে থাকা ইভিএমের বিষয়ে করণীয় ঠিক করতে একটি কমিটি গঠন করে দেন। কমিটির সভাপতি করা হয় নির্বাচন কমিশনের যুগ্ম সচিব মো. মাঈন উদ্দীন খানকে। তবে কমিটি এখন পর্যন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়নি।

নথি বলছে, ২০২২ সাল থেকে দেশের ৪১ জেলা নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে ৭০ হাজার ইভিএম যন্ত্র সংরক্ষিত রয়েছে। প্রতি মাসে সে জন্য ভাড়া দিতে হচ্ছে।

কমিটির একজন সদস্য প্রথম আলোকে বলেন, দুদকের তদন্ত চলমান থাকার পাশাপাশি নিরীক্ষা আপত্তি থাকায় কমিটি তাদের প্রতিবেদন জমা দিতে পারছে না। আবার ইভিএমগুলো পোড়ানো যাচ্ছে না। ফলে উভয় সংকটে পড়েছে নির্বাচন কমিশন। দেড় লাখ ইভিএম নির্বাচন কমিশনের জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সূত্র জানিয়েছে, ইভিএম কেনাকাটায় বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে নির্বাচন কমিশনের তিন কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে দুদক। এ বিষয়ে মামলাও হয়েছে।

বদিউল আলম মজুমদার, সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক।২০১৮ সালে যাঁরা উচ্চমূল্যে নিম্নমানের এসব ইভিএম কেনাকাটার সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।

২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ইভিএম কেনার জন্য ৩ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্প নেয় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। কে এম নূরুল হুদা কমিশন তখন পর্যায়ক্রমে দেড় লাখ ইভিএম কেনে। প্রতিটি ইভিএম কেনা হয় ২ লাখ ৩৫ হাজার টাকায়, যা ভারতের তুলনায় প্রায় ১১ গুণ বেশি।

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষের দিকে ২০২৩ সালে নতুন করে আরও দুই লাখ ইভিএম যন্ত্র কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৮ হাজার ৭১১ কোটি টাকা। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৫০ আসনে ইভিএমে ভোট হওয়ার কথা থাকলেও পরে সে পরিকল্পনা থেকে সরে আসে তৎকালীন সরকার।

গুদামে ভাড়ায় রাখা হচ্ছে

নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেড় লাখ ইভিএম কেনার সময় এগুলো কোথায় রাখা হবে—এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। অর্থ বরাদ্দও রাখা হয়নি। দেড় লাখ সেট ইভিএমের মধ্যে ৭০ হাজার মাঠপর্যায়ের ৪১ জেলায় বেসরকারি গুদামে রাখা হয়েছে। যেখানে প্রতি মাসে ৩৩ লাখ টাকা করে ভাড়া দিতে হচ্ছে। বাকি ৮০ হাজার ইভিএম যন্ত্র বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির (বিএমটিএফ) আধুনিক ওয়্যারহাউসে সংরক্ষিত আছে। ২০১৯ সাল থেকে সেখানে এসব যন্ত্র রাখা হচ্ছে। বিএমটিএফের ওয়্যারহাউস ব্যবহার করায় তারা মাসিক প্রায় এক কোটি টাকা করে ভাড়া চেয়েছে। পাঁচ বছরে ওয়্যারহাউস ব্যবহার করায় বিএমটিএফ ৭২ কোটি টাকা ভাড়া দাবি করেছে নির্বাচন কমিশনের কাছে। এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি চালাচালি করেও সুরাহা হয়নি। ফলে বকেয়া ভাড়ার পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে।

নথি বলছে, ২০২২ সাল থেকে দেশের ৪১ জেলা নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে ৭০ হাজার ইভিএম যন্ত্র সংরক্ষিত রয়েছে। প্রতি মাসে সে জন্য ভাড়া দিতে হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ভাড়া দেওয়া হচ্ছে জামালপুর জেলা নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে। সেখানে বেসরকারি একটি গুদামে আড়াই হাজার ইভিএম রাখা হয়েছে। প্রতি মাসে ভাড়া দিতে হচ্ছে ১ লাখ ৩৭ হাজার টাকা। জেলা নির্বাচন অফিসার মুহাম্মদ আনোয়ারুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ব্যক্তিমালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠানের গুদামে যন্ত্রগুলো রাখা হয়েছে। কখনো তিন মাস পর, কখনো এক মাস পর ভাড়া দেওয়া হচ্ছে।

মানিকগঞ্জ জেলা নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ের মাধ্যমে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের গুদামে সাড়ে তিন হাজার ইভিএম রাখা হয়েছে। এ জন্য প্রতি মাসে ভাড়া দিতে হচ্ছে ১ লাখ ২৯ হাজার ৭৫০ টাকা। জেলা নির্বাচন অফিসার মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ১৫ দিন পরপর ইভিএমের ব্যাটারিতে চার্জ দেওয়ার কথা থাকলেও তা সম্ভব হচ্ছে না। তা ছাড়া গুদামে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত ইভিএম রাখা হয়েছে।

নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ের অতিরিক্ত সচিব কে এম আলী নেওয়াজ প্রথম আলোকে বলেন, দুদকের মামলা থাকার কারণে ইভিএমগুলো পোড়ানো যাচ্ছে না। নিরীক্ষা আপত্তি থাকায় কমিটি তাদের প্রতিবেদন জমা দিতে পারছে না। এখন ইভিএমগুলো গুদামে পড়ে রয়েছে। এসব ইভিএম এখন আর নির্বাচনে ব্যবহার করা যাবে না।

রাজনৈতিক দলগুলোও নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারে বিপক্ষে। নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন তাদের প্রতিবেদনে ইভিএম ব্যবহার না করার সুপারিশ করেছিল। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) থেকেও ইভিএমের অংশ বাদ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, দেড় লাখ ইভিএম সংরক্ষণে পরিকল্পনা কমিশনের কাছে ৪০ কোটি টাকা চেয়েছিল নির্বাচন কমিশন। তবে পরিকল্পনা কমিশন সে টাকা দেয়নি। নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, ইভিএমগুলোর কন্ট্রোল ইউনিট, মনিটর, ব্যাটারি ও ক্যাবলগুলো এখন অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

ইভিএম প্রথম তৈরি করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)। তাদের তৈরি ইভিএম প্রথম ব্যবহার করা হয় ২০১১ সালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে একটি ওয়ার্ডে। পরে ছোট আকারে ইভিএম ব্যবহার শুরু হয়। ২০১৩ সালে রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইভিএমে সমস্যা ধরা পড়ায় পরে ইভিএম ব্যবহার করা হয়নি। এরপর কে এম নূরুল হুদা নেতৃত্বাধীন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের উদ্যোগ নেয়। বিএমটিএফ কমিশনের জন্য ইভিএম তৈরি করে।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, ইভিএমগুলো অকেজো হয়ে গেছে। মেয়াদও শেষ। দুদকের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে এখন এসব ইভিএম অপসারণ করা উচিত। এটি না হলে প্রতি মাসে গুদামভাড়া দিতে হবে। তিনি বলেন, ২০১৮ সালে যাঁরা উচ্চমূল্যে নিম্নমানের এসব ইভিএম কেনাকাটার সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। এটি না করলে ভবিষ্যতে অন্য কেউ অন্য কোনো নামে কেনাকাটা করার সাহস দেখাবে।

Read full story at source