লেনদেন ভারসাম্য রক্ষায় দুই বিলিয়ন ডলারের ঋণের চিন্তা
· Prothom Alo

মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিতে করণীয় বিষয়ে অর্থনীতিবিষয়ক সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এই পরিকল্পনার কথা জানান গভর্নর মোস্তাকুর রহমান।
অভ্যন্তরীণ সংকট ও মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে দেশের অর্থনীতিতে যে চাপ তৈরি হয়েছে, সেই চাপ মোকাবিলায় প্রয়োজনে ২ বিলিয়ন বা ২০০ কোটি মার্কিন ডলারের বিদেশি সহায়তা গ্রহণের পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ। লেনদেনের ভারসাম্য বা ব্যালেন্স অব পেমেন্ট রক্ষায় এই সহায়তার কথা ভাবা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলসহ (আইএমএফ) বৈশ্বিক বিভিন্ন ঋণদাতা সংস্থার কাছ থেকে এই সহায়তা চাওয়া হবে। এমন পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। তবে তিনি এ–ও বলেছেন, বিষয়টি এখনো একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।
Visit saltysenoritaaz.org for more information.
মধ্যপ্রাচ্যের সংকটময় পরিস্থিতিতে করণীয় বিষয়ে দেশের বিভিন্ন সংবাদপত্র ও অনলাইন গণমাধ্যমের বাণিজ্যবিষয়ক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় গভর্নর এই পরিকল্পনার কথা জানান। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সম্মেলনকক্ষে আজ রোববার এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। বেলা সোয়া তিনটা থেকে বিকেল সোয়া পাঁচটা পর্যন্ত প্রায় দুই ঘণ্টা এই সভা চলে। তাতে সভাপতিত্ব করেন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন ডেপুটি গভর্নর নুরুন নাহার, মো. হাবিবুর রহমান, জাকির হোসেন চৌধুরী ও মো. কবীর আহমেদ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান।
—মোস্তাকুর রহমান, গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংকলেনদেনের ভারসাম্য রক্ষায় ২ বিলিয়ন ডলারের সহায়তার বিষয়টি নিয়ে আমরা আলোচনা করছি।...মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে এই মুহূর্তে আমরা সতর্কতার সঙ্গে চলার কৌশল বা নীতি অবলম্বন করছি।সভায় গভর্নর বলেন, ‘লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষায় ২ বিলিয়ন ডলারের সহায়তার বিষয়টি নিয়ে আমরা আলোচনা করছি। এরই মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আইএমএফের সঙ্গে কথা বলেছি। এ ছাড়া অন্যান্য উৎস থেকে এই সহায়তা পাওয়ার বিষয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ বা ইআরডিও চেষ্টা করছে। মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে এই মুহূর্তে আমরা সতর্কতার সঙ্গে চলার কৌশল বা নীতি অবলম্বন করছি।’
সভায় বিদ্যমান পরিস্থিতিতে করণীয় বিষয়ে বিভিন্ন পরামর্শ দেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকেরা। কেউ কেউ বিভিন্ন বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের অবস্থানের বিষয়েও জানতে চান। সাংবাদিকদের এসব পরামর্শ ও প্রশ্নের কিছু কিছু বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে জবাবও দেন গভর্নর, ডেপুটি গভর্নরসহ উপস্থিত বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তারা। সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়, বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বা রিজার্ভ স্বস্তিদায়ক অবস্থায় রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে যাতে কোনো ধরনের অস্থিরতা তৈরি না হয়, সে ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংক সতর্ক রয়েছে।
প্রবাসী আয় নিয়ে আশাবাদ
মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে প্রবাসী আয় ও বিদেশে কর্মসংস্থানে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কার কথা তুলে ধরেন সাংবাদিকেরা। তাই প্রবাসী আয় যাতে কমে না যায়, সে জন্য প্রণোদনা বৃদ্ধি ও প্রবাসীরা দেশে ফিরতে বাধ্য হলে তাঁদের জন্য বিশেষ সহায়তার উদ্যোগ গ্রহণের পরামর্শ দেন সাংবাদিকদের কেউ কেউ। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তারা মনে করেন, আপাতত প্রবাসী আয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার শঙ্কা কম। কারণ হিসেবে উপস্থিত একাধিক ডেপুটি গভর্নর বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রবাসীরা তাঁদের সব সঞ্চয় দেশে পাঠিয়ে দেন। তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তাতে প্রবাসী আয় ও প্রবাসীদের কর্মসংস্থানে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। সভায় জানানো হয়, চলতি অর্থবছর শেষে প্রবাসী আয় গত অর্থবছরের চেয়ে দুই থেকে আড়াই বিলিয়ন ডলার বাড়তে পারে।
সভায় গভর্নর বলেন, ‘এক–দুই বছর পরপর কোনো না কোনো সমস্যা দেখা দিচ্ছে। করোনার পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ—মনে হচ্ছে এ ধরনের সমস্যা সঙ্গে নিয়েই চলতে হবে আমাদের।’
গভর্নরের স্বাগত বক্তব্যের মাধ্যমে শুরু হওয়া সভায় একে একে সাংবাদিকেরা তাঁদের বিভিন্ন পরামর্শ ও প্রশ্ন উত্থাপন করেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে উপস্থিত ডেপুটি গভর্নরসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সেগুলো নোট নেন। এমনকি পুরো আলোচনার বড় অংশজুড়ে গভর্নর নিজেও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ নিজে নোট নেন। পরে গভর্নর তাঁর সভাপতির বক্তব্যে বলেন, ‘যেকোনো সমস্যায় অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ বের করার নীতিতে বিশ্বাসী আমি। এ জন্য আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিকভাবে আমি প্রতিদিনই অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকারসহ সংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে পরামর্শ করছি। দেশীয় চাহিদা বৃদ্ধির মাধ্যমেই অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে হবে। এ জন্য গ্রামীণ অর্থনীতিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।’
অগ্রাধিকারে তিন বিষয়
সভায় গভর্নর জানান, তিনটি অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে কাজ করছেন তিনি। তার মধ্যে প্রথম অগ্রাধিকার কৃষি খাত। দ্বিতীয় অগ্রাধিকার ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাত বা এসএমই। আর তৃতীয় অগ্রাধিকার বন্ধ কারখানা সচল করা। গভর্নর বলেন, ‘আমি মনে করি, বন্ধ কারখানাগুলো জাতীয় সম্পদ। তাই ব্যাংকগুলোকে অনুরোধ করেছি বন্ধ কারখানাগুলোকে চালু করার বিষয়ে এগিয়ে আসতে। কারণ, এসব সম্পদ ব্যবহার করা না হলে দিন দিন সেগুলো নষ্ট হবে।’ গভর্নর বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের স্বার্থে এই মুহূর্তে ঋণের সুদহার কমানো ঠিক হবে না। নতুন বিনিয়োগও সময়সাপেক্ষ। তাই এই মুহূর্তে কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে আমাদের সামনে অন্যতম বিকল্প বন্ধ কারখানা যত দ্রুত সম্ভব সচল করা।’
আমানতকারীর সুরক্ষা
আলোচনায় অংশ নিয়ে সাংবাদিকেরা ব্যাংক ও আর্থিক খাতের আমানতকারীদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনার বিষয়ে নানা পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শ দেন। তাঁরা বলেন, অনেক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে আমানতকারীরা টাকা ফেরত পাচ্ছেন না। ফলে তাঁরা আতঙ্কে আছেন। এ অবস্থায় দুর্বল ও একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আমানতকারীদের টাকা ফেরত পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি। জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়, আমানতকারীদের অর্থ ফেরত পাওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক বেশ সচেষ্ট রয়েছে। গভর্নর বলেন, ‘সম্মিলিত ব্যাংকের কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হবে। অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়নের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেই সিদ্ধান্তও কার্যকর করা হবে। আগামী জুলাইয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার কাজ শুরু করা যাবে বলে আশা করছি।’
অন্যান্য প্রসঙ্গ
পাচার বা চুরি হওয়া অর্থ উদ্ধার কীভাবে কত দ্রুত করা যায়, তা নিয়ে কাজ হচ্ছে বলে জানান গভর্নর। তিনি বলেন, এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো অপ্রকাশযোগ্য চুক্তি (নন ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট) সই করে ফেলেছে। এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে ৪১টি ব্যাংক জড়িত। সেই সঙ্গে আর্থিক খাতকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার কথাও বলেন গভর্নর। তিনি বলেন, ‘ আমার কাছে সবসময় মনে হয়েছে, আর্থিক খাতে রাজনৈতিক প্রভাব থাকা উচিত নয়। আমরা সে লক্ষ্যে কাজ করছি, যাতে কোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব আর্থিক খাতে না আসে। আমার সহকর্মীদের বলেছি, কোনো প্রয়োজনে আমি দায় নিতে রাজি আছি। কিন্তু আপনারা আইনের বাইরে কারও কথা শুনবেন না।’
এ ছাড়া খেলাপিদের তালিকা প্রকাশ, নগদ লেনদেনের বদলে ডিজিটাল লেনদেন বৃদ্ধি, ব্যবসায়ীদের অনাস্থা দূর করা, ঋণের সুদহার কমানো, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, বিদেশযাত্রার ক্ষেত্রে ডলারের কোটা সীমা বাড়ানো, জ্বালানি ভর্তুকি, খাতভিত্তিক ক্ষতিগ্রস্তদের প্রণোদনাসহ নানা বিষয়ে সুপারিশ তুলে ধরেন সাংবাদিকেরা।