খেলোয়াড়দের মোটিভেশন দিতে কোচদের যত পাগলামি: পকেটমার ভাড়া করা কিংবা পিৎজা উৎসব

· Prothom Alo

একটা ড্রেসিংরুমে ২০-২৫ জন তারকা ফুটবলারকে সামলানো সহজ কোনো কাজ নয়। কখনো কখনো মাঠের কৌশলের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়ায় তাঁদের মনস্তত্ত্ব পড়া। আর এই খেলোয়াড়দের অনুপ্রেরণা বা মোটিভেশন দিতে ফুটবল কোচরা মাঝেমধ্যে এমন সব কাণ্ড করেন, যা শুনলে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে।

২০২৪-২৫ প্রাক্-মৌসুমে আর্সেনাল কোচ মিকেল আরতেতা যেমন একবার টিম ডিনারের সময় পেশাদার পকেটমার ভাড়া করেছিলেন! উদ্দেশ্য? খেলোয়াড়দের পকেট থেকে অলক্ষ্যে ফোন আর ওয়ালেট সরিয়ে নেওয়া। আরতেতা চেয়েছিলেন শিষ্যদের শেখাতে—মাঠে ও মাঠের বাইরে সব সময় ‘অ্যালার্ট’ থাকতে হয়।

Visit mchezo.co.za for more information.

মোটিভেশনের নামে আর কী কী ‘পাগলামি’ করেছেন বিশ্বখ্যাত কোচরা? চলুন দেখে নেওয়া যাক এমন কিছু ঘটনা।

ডেভিড ময়েস ও নিশান কারখানা

২০১৬ সালের কথা। সান্ডারল্যান্ডের অবস্থা তখন বেশ খারাপ। প্রথম ১০ ম্যাচে পয়েন্ট মাত্র ২। কোচ ডেভিড ময়েস ভাবলেন, খেলোয়াড়দের বাস্তব জগৎটা দেখানো দরকার। তিনি পুরো দলকে নিয়ে গেলেন স্থানীয় নিশান গাড়ি তৈরির কারখানায়। ময়েস চাইলেন, খেলোয়াড়েরা দেখুক হাড়ভাঙা খাটুনি কাকে বলে। ঠাট্টা করে বলেছিলেন, ‘এভাবে হারতে থাকলে আমাদেরও হয়তো শিগগিরই এই কারখানায় চাকরির দরকার পড়বে!’ রসিকতাটা অবশ্য তিতা সত্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মৌসুম শেষে সান্ডারল্যান্ড রেলিগেটেড হলো আর ময়েসকে চাকরিটা হারাতে হয়। কে জানে, তিনি নিজেই ওই সময় কারখানায় গিয়ে চাকরি খুঁজেছিলেন কি না!

নিশান কারখানায় ডেভিড ময়েস

ব্রেন্ডন রজার্সের রহস্যময় খাম

অ্যানফিল্ডে নিজের প্রথম মৌসুমে ব্রেন্ডন রজার্স এক অদ্ভুত চাল চেলেছিলেন। খেলোয়াড়দের সামনে তিনটি খাম উঁচিয়ে বলেছিলেন, ‘এখানে এমন তিনজনের নাম আছে যারা এই মৌসুমে আমাদের দলটাকে ডুবিয়ে দেবে।’ ব্যস, দলে হুলুস্থুল! সবাই নিজেদের সেরাটা দিতে উন্মুখ। পরে জানা গেল, খামগুলো আসলে ফাঁকা ছিল! তবে গ্লেন জনসন বা ব্র্যাড জোনসদের মতো অভিজ্ঞদের ফাঁকি দেওয়া যায়নি। তাঁরা আগে জোসে মরিনিওকেও এমন করতে দেখেছিলেন। গোলরক্ষক ব্র্যাড জোনস পরে বলেছিলেন, আলোর বিপরীতে খামগুলো দেখেই বুঝেছিলাম, ভেতরে কিছুই নেই!

ফ্রি–কিক থেকে আসলে কার গোলসংখ্যা কত, মেসি–রোনালদো কোথায়

স্যাম অ্যালারডাইস: গ্ল্যাডিয়েটর যখন ব্যর্থ

বিগ স্যামের আত্মবিশ্বাস ছিল আকাশচুম্বী। একবার তো বলেছিলেন, রিয়াল মাদ্রিদের দায়িত্ব পেলে তিনি প্রতি মৌসুমেই ডাবল জিততেন! কিন্তু বার্নাব্যু থেকে ফোন না আসায় তিনি দায়িত্ব নেন ব্ল্যাকবার্ন রোভার্সের। একবার দল নিয়ে গেলেন ওল্ড ট্রাফোর্ডে। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ডেরায় যাওয়ার আগে খেলোয়াড়দের রক্ত গরম করতে তিনি ড্রেসিংরুমে দেখালেন রাসেল ক্রোর ‘গ্ল্যাডিয়েটর’ আর জেরার্ড বাটলারের ‘৩০০’ সিনেমার বীরত্বগাথা। ফল? ওই ম্যাচে ৭-১ গোলে বিধ্বস্ত হয়েছিল ব্ল্যাকবার্ন। যুদ্ধংদেহী সিনেমার চেয়ে মাঠের ফুটবলটাই যে আসল, সেদিন হাড়ে হাড়ে বুঝেছিলেন অ্যালারডাইস।

স্যাম অ্যালারডাইস

ক্লডিও রানিয়েরি ও পিৎজা পার্টি

লেস্টার সিটির রূপকথার সেই ২০১৫-১৬ মৌসুম। শুরুতে রক্ষণ ছিল বেশ নড়বড়ে। রানিয়েরি ঘোষণা দিলেন, ক্লিন শিট রাখতে পারলে দলকে পিৎজা খাওয়াবেন। ক্রিস্টাল প্যালেসকে ১-০ গোলে হারানোর পর রানিয়েরি দলকে নিয়ে গেলেন পিৎজার দোকানে। তবে সেখানে গিয়ে দেখা গেল অন্য দৃশ্য—পিৎজাটা খেলোয়াড়দের নিজেদেরই বানাতে হবে! ইতালিয়ান কোচের বার্তা ছিল পরিষ্কার, ‘নিজের রুটিরুজির সংস্থান নিজেকেই করতে হয়।’ এরপর সেই যে লেস্টারের রক্ষণ দুর্গ হয়ে উঠল, বাকিটা তো ইতিহাস।

রিয়াল সভাপতিকে জোড়া গোল উপহার ভিনির

রেনে ময়েলেনস্টিনের ‘চিড়িয়াখানা’

২০০৬ সালে ব্রন্ডবির কোচ থাকাকালীন উয়েফা কাপে ম্যাচের আগে ডাচ কোচ রেনে ময়েলেনস্টিন এক অদ্ভুত প্রশ্ন করলেন অধিনায়ক পার নিলসেনকে। জিজ্ঞেস করলেন, ‘আজ ম্যাচে তুমি কোন প্রাণীর মতো খেলতে চাও?’ নিলসেন উত্তর দিলেন, ‘সাপ’। এরপর ময়েলেনস্টিন একে একে অন্যদেরও একই প্রশ্ন করলেন। কেউ হলো জিরাফ, কেউ বাঘ, কেউবা শিয়াল। ময়েলেনস্টিন সব প্রাণীর হিংস্রতা নিয়ে কথা বললেন। জঙ্গল জয়ের নেশা ড্রেসিংরুমে জাগালেও মাঠে কাজ হয়নি। ব্রন্ডবি ৪-০ গোলে হেরেছিল, আর তাদের দুই খেলোয়াড় লাল কার্ড দেখে মাঠ ছেড়েছিলেন।

গ্লেন হডল

গ্লেন হডল ও পজিটিভ এনার্জি

১৯৯৮ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে নামার আগে ইংল্যান্ডের কোচ হডল তাঁর স্টাফদের বললেন মাঠের চারদিকে ঘড়ির কাঁটার উল্টো দিকে হাঁটতে। তাতে নাকি ‘পজিটিভ এনার্জি’ তৈরি হয়! গ্যারি নেভিল পরে জানিয়েছিলেন, ম্যাচের আগে হডল সবার হৃৎপিণ্ডের ওপর হাত রেখে একধরনের আধ্যাত্মিক পরশ দিতেন। কিন্তু সেই এনার্জি পেনাল্টি শুটআউট পর্যন্ত পৌঁছায়নি। ইংল্যান্ড সেই চিরাচরিত নিয়মে হেরেই বিদায় নিয়েছিল।

আন্তোনিও কন্তে

আন্তোনিও কন্তের ‘গডফাদার’ স্টাইল

চেলসিতে প্রথম মৌসুমেই রেকর্ড ৩০ জয় নিয়ে শিরোপা জিতেছিলেন কন্তে। তিনি ড্রেসিংরুমে টেনশন তৈরি করতে ভালোবাসতেন। কিন্তু পরের মৌসুমেই সেই টেনশন বিষাক্ত হয়ে উঠল। দলের প্রাণভোমরা ডিয়েগো কস্তাকে স্রেফ একটা খুদে বার্তায় ‘গুডবাই’ বলে দিলেন কন্তে। কস্তা চটলেন, চটলেন উইলিয়ানও। কন্তের বিদায়ের পর উইলিয়ান তো বলেই দিয়েছিলেন, ‘আশা করি নতুন কোচ কন্তের মতো হবেন না।’

ইরান নারী ফুটবল দল: স্বাধীনতার খোঁজে এক দুঃসাহসিক যাত্রা

মরিসিও সারি: যখন কোচই হাল ছেড়ে দেন

কন্তের পর চেলসির দায়িত্ব নেওয়া মরিসিও সারি তো ড্রেসিংরুম সামলানোর চেষ্টাই ছেড়ে দিয়েছিলেন। আর্সেনালের কাছে হারের পর মেজাজ হারিয়ে বলেছিলেন, ‘এই খেলোয়াড়দের মোটিভেট করা অসম্ভব।’ এমনকি বোর্নমাউথের কাছে ৪ গোল খাওয়ার পর সার বললেন, ‘এই দলের কোচই দরকার নেই, তারা কোচ ছাড়াই জিততে পারে।’ চেলসির সেই টালমাটাল দিনগুলোতে কোচের চেয়ে খেলোয়াড়দের দাপটই ছিল বেশি।

এরিক ক্যান্টোনা ও স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন

স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন ও ক্যান্টোনার লেবুরঙা স্যুট

অ্যাবারডিনে থাকার সময় অবাধ্য খেলোয়াড়দের নর্থ সির হিমশীতল পানিতে নামিয়ে দিতেন ফার্গুসন। কিন্তু ওল্ড ট্রাফোর্ডে এসে তিনি কিছুটা নরম হলেন। তাঁর ‘হেয়ার ড্রায়ার’ ট্রিটমেন্টের গল্প তো সুবিদিত। তবে প্রিয় শিষ্যদের বেলায় তিনি ছিলেন একেবারেই আলাদা। অনেক কিছুই ক্ষমা করে দিতেন। তেমনি এক প্রিয় শিষ্য ছিলেন এরিক ক্যান্টোনা।

একবার এক সিনেমার প্রিমিয়ারে সবাইকে ‘ব্ল্যাক টাই’ পরে আসতে বলেছিলেন স্যার অ্যালেক্স। ক্যান্টোনা গেলেন হলদেটে লেবু রঙের স্যুট আর নাইকি ট্রেনার পরে। সবাই যখন ঝড়ের অপেক্ষা করছে, ফার্গুসন ক্যান্টোনাকে দেখে মুচকি হেসে বললেন, ‘তোমাকে চমৎকার দেখাচ্ছে!’ কে জানে, কোচের এমন আশকারা পেতেন বলেই হয়তো ক্যান্টোনা মাঝেমধ্যে মাঠে এমন বেপরোয়া হয়ে যেতেন।

Read full story at source