নানা দেশের সাহিত্যে রমজানের জীবন–ক্যানভাস
· Prothom Alo

প্রতিবছর রমজানের আগমনে মুসলিম উম্মাহ রোজার আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যে অবগাহন করে। এই ঐতিহ্য কেবল ইবাদতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং হয়ে উঠেছে সাহিত্যের এক সমৃদ্ধ বুনন।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
যুগ যুগ ধরে কবি ও সাহিত্যিকেরা রমজানের দিনগুলোকে অর্থবহ ও জীবন্ত ক্যানভাসে রূপান্তর করেছেন।
আল–জাজিরা ডটনেট সিরিয়া, ইরান, ভারত ও গিনির গবেষক ও সাহিত্যিকদের বয়ানে রমজানের সেই রূপচ্ছবি তুলে ধরেছে, যেখানে ধর্মীয় বিধানের গণ্ডি পেরিয়ে রোজা হয়ে উঠেছে এক উন্মুক্ত নান্দনিক শিল্প।
সিরীয় অভিজ্ঞতা
সিরীয় সংস্কৃতিতে রমজান মানেই আনন্দ আর প্রার্থনার হাতছানি। সিরীয় ঔপন্যাসিক ইব্রাহিম আল-ইউসেফ রমজানের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের কথা বলতে গিয়ে একে একটি ‘উন্মুক্ত স্মৃতির’ সঙ্গে তুলনা করেছেন।
তাঁর মতে, প্রাচীন কবিরা মরুভূমির রুক্ষতা আর যুদ্ধের প্রয়োজনে ক্ষুধার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন, কিন্তু রমজানের ক্ষুধা হলো একটি ‘নৈতিক ও ইমানি নির্বাচন’।
আল-ইউসেফ বলেন, ‘ক্ষুধা মানুষের ভঙ্গুরতাকে উন্মোচন করে, তৃষ্ণা তাকে তার সীমানা মনে করিয়ে দেয় আর নীরবতা দেয় নিজের অন্তরের কণ্ঠস্বর শোনার সুযোগ। রমজান কেবল দস্তরখানের মাস নয়, এটি ধৈর্যের এক মহান স্বর্গীয় একাডেমি।’
ধ্বংসস্তূপের মাঝে একটি সিরিয়ান পরিবারের ইফতারইফতার আয়োজন, তারাবিহ ও ইবাদতে ব্যস্ত কানাডার বাংলাদেশিরাইরানি অভিজ্ঞতা
ইরানি লেখক ও অনুবাদক হামিদ রেজা মোহাজেরানি রমজানকে দেখেন ইন্দ্রিয় ও আত্মার এক অপূর্ব সংমিশ্রণ হিসেবে। ইরানিরা রমজানে তাজা রুটির ঘ্রাণ আর আপেলের সুবাসের মাঝে মাওলানা জালালুদ্দিন রুমির গজল শোনে।
রুমির একটি পঙ্ক্তি রোজা দর্শনের সারসংক্ষেপ তুলে ধরে, ‘এই মুখ বন্ধ হলো তো খুলে গেল অন্য এক মুখ, যেন আহারকারী হতে পারে রহস্যের লোকমা।’
মোহাজেরানি বলেন, ইরানি সাহিত্যে রমজান হলো একটি ‘পবিত্র অতিথি’ বা ‘আধ্যাত্মিক বসন্ত’। এখানে রোজাকে তুলনা করা হয়েছে এমন এক প্রদীপের সঙ্গে, যা নফসের অন্ধকার দূর করে এবং এমন এক নদীর সঙ্গে, যা আত্মার সব কলুষতা ধুয়ে দেয়।
ইরানে ইফতারের পূর্বেভারতীয় অভিজ্ঞতা
ভারত উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে কেরালা সরকারি কলেজের অধ্যাপক আবদুল গফুর আল-হাদাওয়ি রমজান শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত ও দার্শনিক বিশ্লেষণ তুলে ধরেন।
তিনি মনে করেন, ঈদ বা হজের উৎসবগুলো অনেকটা বাহ্যিক উদযাপনের ফ্রেমে বন্দি থাকলেও রমজান মানুষের শারীরিক প্রয়োজন আর আত্মার আকাঙ্ক্ষার মাঝে এক শৈল্পিক সত্য উন্মোচন করে।
ভারতীয় কবি আনোয়ার আবদুল্লাহ আল-ফাদফারির ভাষায়, ‘তোমাদের ওপর উদিত হলো কল্যাণের ওপর কল্যাণময় মাস, যার আলো পূর্ণিমার চাঁদের মতো হৃদয়ে জ্যোতি ছড়ায়।’
আল-হাদাওয়ি মনে করেন, রমজানের ক্ষুধা কোনো ‘বাধ্যতামূলক বঞ্চনা’ নয়, বরং এটি একটি ‘সচেতন নির্বাচন’, যা প্রবৃত্তি বা ইনস্টিংক্টকে বিবেকের শাসনে নিয়ে আসে। খালি পেট এখানে একটি আয়না হয়ে দাঁড়ায়, যেখানে ধনী ব্যক্তি গরিবের ভুলে যাওয়া মুখচ্ছবি দেখতে পায়।
পাকিস্তানে এক মুসাফিরকে ইফতার করাচ্ছেন এক নারীসাহারা মরুর বুকে কোরআনের সুর আর ঐতিহ্যের সুবাসআফ্রিকান অভিজ্ঞতা
পশ্চিম আফ্রিকার গিনি কোনাক্রি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাবা ইমরান তুলে ধরেন আফ্রিকার সামাজিক প্রেক্ষাপটে রমজানের রূপ। সেখানে রমজান মানেই বিশেষ খাবার, ইফতারের জামাত আর তারাবির নামাজের এক অন্যরকম আমেজ।
নাইজেরিয়ান কবি আবদুর রহমান আল-জাকারি তাঁর কবিতায় রমজানকে এক ‘সুগন্ধি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।
অন্যদিকে গাম্বিয়ান কবি মুহাম্মদ আল-ইমাম গাসামা রমজানকে আধ্যাত্মিক সংগ্রামের মাস এবং পারস্পরিক ক্ষমা ও সদকার মাস হিসেবে অভিহিত করেছেন।
সেনেগালের প্রখ্যাত আলেম শেখ আহমাদ বাম্বা রমজানকে ‘সেরা অতিথি’ (খাইরু দাইফ) হিসেবে সম্বোধন করে কাব্য রচনা করেছেন।
ইথিওপিয়ার আদ্দিস আবাবায় হাজারো প্রাণের মিলনমেলাএকটি সমন্বিত ক্যানভাস
এই চারটি ভিন্ন প্রান্তের কণ্ঠস্বর একটি অভিন্ন সত্যই তুলে ধরে—রমজান কেবল একটি নিশ্চল ধর্মীয় আচার নয়, বরং এটি সৃজনশীলতার এক অফুরন্ত খনি।
ইরানে: রমজান এক নূরানি অতিথি ও আধ্যাত্মিক বসন্ত।
পশ্চিম আফ্রিকায়: এটি সামাজিক ঐতিহ্য ও কাব্যিক ঘ্রাণ।
ভারতে: এটি দার্শনিক উপলব্ধি ও মনস্তাত্ত্বিক জাগরণ।
সিরিয়ায়: এটি ব্যক্তিগত স্মৃতি আর বিবেকের পরীক্ষা।
ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক ভিন্নতা সত্ত্বেও একটি সুতো সবাইকে গেঁথে রেখেছে—তা হলো ‘অর্থের সন্ধান’। যেখানে শরীর মিলিত হয় আত্মার সঙ্গে, ব্যক্তি মিলিত হয় সমষ্টির সঙ্গে আর জমিন মিলিত হয় আসমানের সঙ্গে।
সূত্র: আল–জাজিরা ডট নেট
পবিত্র রমজানের সন্ধ্যায় কুয়েতের রান্নাঘরে ঐতিহ্যের ঘ্রাণ