চ্যাম্পিয়নস লিগে ম্যান সিটি, চেলসি, টটেনহামের কি কোনো আশা আছে, ইতিহাস কী বলে

· Prothom Alo

উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের নকআউট পর্বে সাধারণত একপেশে ফল কমই দেখা যায়। কিন্তু এবার শেষ ষোলোর প্রথম লেগে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। কয়েকটি ম্যাচে হারের ব্যবধান এত বড় যে নাটকীয় কোনো প্রত্যাবর্তন না ঘটলে বেশ কয়েকটি দ্বৈরথের ভাগ্য বলা যায় আগেই নির্ধারিত হয়ে গেছে।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

গত মঙ্গলবার ও বুধবারের ম্যাচগুলো মিলিয়ে শেষ ষোলোর প্রথম লেগের আটটি ম্যাচের মধ্যে অন্তত পাঁচটিতেই গোলের ব্যবধান তিন বা তার বেশি। বিশাল ব্যবধানে পিছিয়ে থাকা দলগুলোর কেউ কেউ হয়তো আগামী সপ্তাহে ঘুরে দাঁড়ানোর আশা রাখছে। তবে অনেকেরই ধারণা হচ্ছে, ওই পাঁচটি দ্বৈরথের ফলাফল প্রায় নিশ্চিত হয়ে গেছে।

গত মঙ্গলবার আতলেতিকো মাদ্রিদ প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়নস লিগ নকআউট ম্যাচে পাঁচ গোল করে টটেনহামকে (৫–২) হারায়। একই রাতে আতালান্তা ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় যৌথভাবে সবচেয়ে বড় পরাজয়ের স্বাদ পেয়েছে, ঘরের মাঠে বায়ার্ন মিউনিখের কাছে হেরে যায় ৬–১ গোলে। গত বুধবার চার ম্যাচের মধ্যে তিনটিতেই জয়–পরাজয়ের ব্যবধান ছিল তিন গোলের। রিয়াল মাদ্রিদের কাছে ম্যানচেস্টার সিটি হেরেছে ৩–০ গোল, একই ব্যবধানে বোডো/গ্লিমট হারায় স্পোর্তিং লিসবনকে আর পিএসজির বিপক্ষে চেলসির হার ৫–২ গোলের।

শুরুতে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটটা একবার দেখে নেওয়া যাক। কারণ, বাস্তবতা যতই কঠিন হোক না কেন, ইতিহাসে ঘুরে দাঁড়ানোর রসদ ঠিকই থাকে। যেমন বাস্তবতা বলছে টটেনহামের ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা খুবই কম। কারণ, তাদের বর্তমান ফর্ম খুবই খারাপ।

গত মঙ্গলবারের হার দিয়ে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে টানা ছয় ম্যাচ হেরেছে তারা, যা ক্লাব ইতিহাসে প্রথম। ফলে পরের লেগে তাদের ঘুঁরে দাঁড়িয়ে ৩ গোলের ব্যবধান ঘোচানো বেশ কঠিন। অন্যদিকে একই ব্যবধানে পিছিয়ে থাকলেও ম্যানচেস্টার সিটি, চেলসি কিংবা স্পোর্তিং লিসবনের ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনাকে তুলনামূলকভাবে বেশি বাস্তবসম্মত মনে করা হচ্ছে। তবে সামগ্রিকভাবে চার দলেরই সামনে একই রকম কঠিন চ্যালেঞ্জ, টপকাতে হবে বিশাল এক পাহাড়।

চ্যাম্পিয়নস লিগে এ কোন দুর্দশায় ‘বিশ্বসেরা’ প্রিমিয়ার লিগের পরাশক্তিরা

চ্যাম্পিয়নস লিগে অতীতের নকআউট পর্বে ফিরে তাকালে চারটি উল্লেখযোগ্য প্রত্যাবর্তনের দৃষ্টান্ত পাওয়া যাবে। সেই ম্যাচগুলো ছিল ২০০৩–০৪ মৌসুমে এসি মিলানের বিপক্ষে দেপোর্তিভো লা করুনা, ২০১৬–১৭ মৌসুমে পিএসজির বিপক্ষে বার্সেলোনা, ২০১৭–১৮ মৌসুমে বার্সেলোনার বিপক্ষে রোমা এবং ২০১৮–১৯ মৌসুমে বার্সেলোনার বিপক্ষে লিভারপুলের।

এর মধ্যে ২০১৬–১৭ মৌসুমে পিএসজির বিপক্ষে বার্সেলোনার প্রত্যাবর্তনটিই সবচেয়ে বড় চমক হয়ে আছে। শেষ ষোলো প্রথম লেগে ৪–০ গোলে হেরে যাওয়ার পর ফিরতি লেগে ৬–১ গোলে জিতে পরের রাউন্ডে ওঠে বার্সা। চ্যাম্পিয়নস লিগের ইতিহাসে নকআউটে প্রথম লেগে চার গোল পিছিয়ে থেকেও ঘুরে দাঁড়ানোর একমাত্র নজির এটিই।

চেলসি কি পারবে ঘুরে দাঁড়াতে

সেটা ছিল চ্যাম্পিয়নস লিগের ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় দ্বৈরথ। উনাই এমেরির পিএসজি প্রথম লেগে বার্সেলোনাকে (৪–০) একরকম উড়িয়ে দিয়েছিল। ফলে ফিরতি লেগে কাতালানদের সামনে কঠিন সমীকরণ দাঁড়ায়। তবে লিওনেল মেসি–নেইমাররা সেবার অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন। দুই লেগ মিলিয়ে ৬–৫ গোলে জিতে বাজিমাত করেছিল বার্সা।

২০০৩–০৪ মৌসুমের পর সেটিই ছিল প্রথমবার, যখন কোনো দল প্রথম লেগে তিন বা বেশি গোলের ব্যবধান পুষিয়ে দিয়ে ঘুরে দাঁড়ায়। যে কীর্তির সূচনা করেছিল দেপোর্তিভো লা করুনা। সান সিরোয় কোয়ার্টার ফাইনালে প্রথম লেগে এসি মিলানের কাছে ৪–১ গোলে হেরেছিল তারা। কিন্তু ফিরতি লেগে ৪–০ গোলে জিতে পৌঁছে যায় সেমিফাইনালে।

দেপোর্তিভো লা করুনার কীর্তির পর এমন ঘটনা দেখতে অপেক্ষা করতে হয় আরও ১৩ বছর। সেটা সেই বার্সা–পিএসজি ম্যাচের কল্যাণে। তবে গত কয়েক বছরে এমন দৃষ্টান্ত একাধিকবার দেখা গেছে। ২০১৭ ও ২০১৮ সালে তিন গোলে পিছিয়ে থাকার পর ঘুরে দাঁড়িয়ে জিতেছিল এএস রোমা ও লিভারপুল। দুবারই ট্র্যাজেডির শিকার হওয়া দলটির নাম বার্সেলোনা।

২০১৮ সালে কোয়ার্টার ফাইনাল প্রথম লেগে ক্যাম্প ন্যুতে এএস রোমার বিপক্ষে বার্সেলোনার ৪–১ গোলের জয়ের পর বার্সার সেমিফাইনাল মনে হচ্ছিল হাতছোঁয়া দূরত্বে। কিন্তু ফিরতি লেগে অবিশ্বাস্যভাবে ঘুরে দাঁড়ায় রোমা। ৩–০ গোলে জিতে অ্যাওয়ে গোলের সুবিধা নিয়ে চলে যায় সেমিফাইনালে।

অবিশ্বাস্য ভালভের্দে ‘বিশ্বের সবচেয়ে অবমূল্যায়িত ফুটবলার’

এর প্রায় ১৩ মাস পর আবারও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখেছে বার্সা। ক্যাম্প ন্যুতে লিভারপুলের বিপক্ষে সেমিফাইনাল প্রথম লেগে ৩–০ গোলের জয় পেয়েছিল তারা। সে ম্যাচে জোড়া গোল করেছিলেন লিওনেল মেসি। তখন মনে হচ্ছিল, চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে বার্সা এক পা দিয়ে রেখেছে। কিন্তু অ্যানফিল্ডে প্রত্যাবর্তনের অবিশ্বাস্য এক গল্প লেখে লিভারপুল।

ম্যাচে ৪–০ গোলের জয়ে তারা ঘুরে দাঁড়ায়। ম্যাচের ফল নির্ধারক গোলটি আসে এখন প্রায় কিংবদন্তি হয়ে যাওয়া দ্রুত নেওয়া কর্নার থেকে। ট্রেন্ট আলেকসান্দার–আরনল্ডের নেওয়া কর্নারে গোলটি করেন ডিভক ওরিগি। এর পর থেকে চ্যাম্পিয়নস লিগে তিন বা চার গোল পিছিয়ে থেকেও কোনো দলকে আর নকআউট পর্বে ঘুরে দাঁড়িয়ে জিততে দেখা যায়নি।

প্রথম লেগে হার থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর সবচেয়ে ভালো সম্ভাবনা আছে ম্যান সিটির। সুপারকম্পিউটারের হিসাবে দলটির কোয়ার্টার ফাইনালে যাওয়ার সম্ভাবনা ১৬.৩৮ শতাংশ।

অবাক করার বিষয় হলো, ইতিহাসে এমন উদাহরণ খুব বেশি নেই। মোট ৫১টি দ্বৈরথে প্রথম লেগে কোনো দল তিন বা তার বেশি গোলের ব্যবধানে জিতেছে। এর মধ্যে মাত্র চারবার প্রতিপক্ষ দল শেষ পর্যন্ত ঘুরে দাঁড়িয়ে জয় পেয়েছে—অর্থাৎ প্রায় ৭.৮ শতাংশ ক্ষেত্রে এমন নাটকীয় প্রত্যাবর্তন ঘটেছে।

চলতি মৌসুমের প্লে–অফ পর্বেই প্রায় এমন একটি প্রত্যাবর্তন দেখতে যাচ্ছিল ফুটবল দুনিয়া। প্রথম লেগে ইস্তাম্বুলে গালাতাসারাইয়ের কাছে ৫–২ গোলে হেরেছিল জুভেন্টাস। ফিরতি লেগে নির্ধারিত ৯০ মিনিট শেষে ৩–০ গোলে এগিয়ে গিয়ে ম্যাচকে অতিরিক্ত সময়ে নিয়ে যায় জুভরা। তবে অতিরিক্ত সময়ে দুই গোল করে গালাতাসারাই শেষ পর্যন্ত শেষ ষোলোয় ওঠা নিশ্চিত করে।

যেহেতু ইতিহাস আছে, কিছু ইঙ্গিত আছে, ফলে সামান্য হলেও আশা আছে। কিন্তু বাস্তবে কতটা সম্ভব ম্যান সিটি, চেলসি আর টটেনহামের মতো দলগুলোর কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা? অপ্টা সুপারকম্পিউটার বলছে, প্রথম লেগে হার থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর সবচেয়ে ভালো সম্ভাবনা আছে ম্যান সিটির। সুপারকম্পিউটারের হিসাবে দলটির কোয়ার্টার ফাইনালে যাওয়ার সম্ভাবনা ১৬.৩৮ শতাংশ।

পরের অবস্থানে আছে স্পোর্তিং লিসবন; তাদের বোডো/গ্লিমটকে হারিয়ে শেষ আটে ওঠার সম্ভাবনার মাত্রা ১৩.৩ শতাংশ। এরপর আছে চেলসি (৭.২৬ শতাংশ) এবং টটেনহাম (৩.১৬ শতাংশ)। আর বায়ার্নকে হারিয়ে আতালান্তার পরের রাউন্ডে যাওয়ার সম্ভাবনা মাত্র ০.০১ শতাংশ। তবে এই সামান্য সম্ভাবনাকেও যদি কোনো দল কাজে লাগিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর নতুন গল্প লেখে, তবে সেটিই জন্ম দেবে নতুন এক রোমাঞ্চের, নতুন এক ইতিহাসের।

Read full story at source