তুরস্ক কেন ইরান যুদ্ধ এড়ানোর সুযোগ পাবে না

· Prothom Alo

তুরস্ক এখন একধরনের অস্বস্তিকর উত্তেজনার মধ্যে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি আঙ্কারার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সম্প্রতি এমন একটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে, যা সম্ভবত তুরস্কের দিকে যাচ্ছিল। একই সময়ে তুরস্কের নেতারা আরও একটি বিষয় নিয়ে উদ্বিগ্ন।

Visit een-wit.pl for more information.

বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ওয়াশিংটন ইরানের বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছে। এর মধ্যে কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর কথাও আছে। এমনকি তাদের অস্ত্র দিয়ে ইরানের ভেতরে বিদ্রোহ উসকে দেওয়ার কথাও ভাবা হচ্ছে।

যদিও তুরস্কের কুর্দি রাজনৈতিক দল এ ধরনের প্রস্তাব নাকচ করেছে। তবু এই আলোচনা তুরস্কের কাছে পুরোনো এক অভিজ্ঞতার স্মৃতি আবারও জাগিয়ে তুলেছে। সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র যখন কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি বা পিকেকে–ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে কাজ করেছিল, তখন ন্যাটোর মিত্র যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্কের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল।

তেহরানে বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া সরকার পরিবর্তনের ধারণাকে আঙ্কারা কোনোভাবেই স্থিতিশীলতার সমাধান হিসেবে দেখে না। বিশেষ করে বড় আকারের সামরিক অভিযান বা প্রক্সি গোষ্ঠী ব্যবহার করে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টা তুরস্কের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।

ওয়াশিংটন এই যুদ্ধে কীভাবে এগোয় এবং ইসরায়েলের আরও বড় আঞ্চলিক লক্ষ্যকে কতটা সমর্থন দেয়, তা সরাসরি তুরস্কের স্বার্থকে প্রভাবিত করবে। এ কারণেই ইরান ঘিরে এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্কের সম্পর্কের জন্য নতুন এক বড় পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।

যদি ওয়াশিংটন ও আঙ্কারা সতর্কভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারে, তবে দুই দেশের সম্পর্কে ফাটল ধরতে পারে। বিশেষ করে ইরানে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের কৌশলে যুক্তরাষ্ট্র যদি তুরস্কবিরোধী কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ায়, তবে সেটা হবে তুরস্কের জন্য ভয়াবহ ধাক্কা।

তুরস্কের আরেকটি মূল্যায়ন হলো, উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা চালিয়ে ইরান কৌশলগত ভুল করেছে। এতে দ্রুত কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ সংকুচিত হয়েছে। একই সঙ্গে ইরান ও আরব দেশগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা থেকে বেরিয়ে আসার সম্ভাবনাও কমে গেছে।

ক্ষমতাসীন জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি বা একেপি সরকারের সময়ে তুরস্ক কিছু ক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করেছে। তবে ইরানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের প্রতিযোগিতা থাকা সত্ত্বেও আঙ্কারা বাইরের শক্তির মাধ্যমে তেহরানের ভাগ্য নির্ধারণের পক্ষে নয়। এর পেছনে একটি দীর্ঘদিনের বিশ্বাস কাজ করছে। বাইরের শক্তির উদ্যোগে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক মানচিত্র নতুন করে সাজানোর চেষ্টা ইতিহাসে প্রায় সব সময়ই স্থিতিশীলতার বদলে অস্থিরতা তৈরি করেছে।

বর্তমান উত্তেজনা ঠেকাতে তুরস্ক যে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়েছিল, সেটিও এই যুক্তি থেকেই করা হয়েছিল। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের মতে, যুদ্ধের আগে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে মধ্যস্থতার চেষ্টা করা হলেও শেষ পর্যন্ত তেহরানের ভুল হিসাব–নিকাশের কারণে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। এখন ওয়াশিংটনের যুদ্ধের লক্ষ্য নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা আসায় আঙ্কারার উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

আবারও তুরস্ক নিজেকে এমন এক পরিস্থিতির সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখছে, যেখানে আঞ্চলিক অস্থিরতার বড় ঝুঁকি রয়েছে এবং ঘটনাপ্রবাহের কেন্দ্রেই রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে তুরস্কের নীতিনির্ধারকেরা ভাবছেন, এই সংঘাত যদি আরও বিস্তৃত হয়, তাহলে তা মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক শক্তির ভারসাম্যকে কীভাবে বদলে দিতে পারে।

আঙ্কারার দৃষ্টিতে, ইরানকে অস্থিতিশীল করে মধ্যপ্রাচ্যকে আরও বিভক্ত করে তোলা পুরো অঞ্চলের জন্য ক্ষতিকর হবে। এতে ইসরায়েলের কিছু কৌশলগত লক্ষ্য পূরণ হতে পারে, কিন্তু তুরস্কের আঞ্চলিক পরিকল্পনা দুর্বল হয়ে যাবে। তুরস্ক বরং অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতার ভিত্তিতে আঞ্চলিক সমন্বয় গড়ে তুলতে চায়।

তাদের ধারণা, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো একসঙ্গে কাজ করলে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার দায়িত্ব নিজেরাই বেশি নিতে পারবে এবং যুক্তরাষ্ট্রও অন্য অগ্রাধিকারে মনোযোগ দিতে পারবে। তাই আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের উচিত তুরস্কের উদ্বেগ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা।

ইরানের বদলে যেভাবে তুরস্ক হয়ে উঠছে ইসরায়েলের জন্য হুমকি

ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য বোঝার চেষ্টা করতে গিয়ে আঙ্কারা ইসরায়েলের অবস্থানের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য দেখছে। তুরস্ক মনে করে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান অনেকটাই পরিস্থিতিনির্ভর এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিসহ নানা কারণে প্রভাবিত। তাই দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ বা শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের বিষয়ে তাঁর অঙ্গীকার চূড়ান্ত না–ও হতে পারে।

কিন্তু ইসরায়েলের লক্ষ্যকে আঙ্কারা অনেক বেশি দীর্ঘমেয়াদি ও কাঠামোগত মনে করে। তাদের মতে, ইসরায়েল এমন এক আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য গড়ে তুলতে চায়, যেখানে অন্য শক্তিগুলো, বিশেষ করে তুরস্ক পিছিয়ে হয়ে পড়ে।

ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের সাম্প্রতিক কঠোর বক্তব্য এই ধারণাকে আরও জোরালো করেছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও অঞ্চলে নতুন শক্তি–জোটের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কথা বলেছেন। সিরিয়া, পূর্ব ভূমধ্যসাগর ও আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলে তুরস্ক ও ইসরায়েলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ইতিমধ্যেই স্পষ্ট।

বর্তমান সংকট সেই প্রতিযোগিতাকে ইরানের ভেতরেও ছড়িয়ে দিতে পারে, বিশেষ করে যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল পিকেকে–ঘনিষ্ঠ কুর্দি গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দেয়। তুরস্কের আশঙ্কা, ওয়াশিংটন হয়তো তাদের নিরাপত্তা উদ্বেগ উপেক্ষা করে এমন নীতি নিতে পারে, যা দীর্ঘ মেয়াদে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

তুরস্কের আরেকটি মূল্যায়ন হলো, উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা চালিয়ে ইরান কৌশলগত ভুল করেছে। এতে দ্রুত কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ সংকুচিত হয়েছে। একই সঙ্গে ইরান ও আরব দেশগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা থেকে বেরিয়ে আসার সম্ভাবনাও কমে গেছে।

এই হামলাগুলো অনেক আরব দেশের কাছে ইসরায়েলের সেই যুক্তিকে শক্তিশালী করেছে যে ইরানের শাসনব্যবস্থাকে শক্ত হাতে দমন করা প্রয়োজন। ফলে এর আগে যে বিষয়টি অঞ্চলজুড়ে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ছিল; অর্থাৎ গাজা সংকট এবং ইসরায়েলের কঠোর আঞ্চলিক নীতি, তা আড়ালে পড়ে গেছে।

ইরান যুদ্ধ উন্মুক্ত করেছে আমাদের আবেগ, দ্বিধা ও নানা প্রশ্ন

এই পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনের কাছে আঙ্কারার দুটি প্রত্যাশা রয়েছে। প্রথমত, ইরানের সঙ্গে সংঘাত এমনভাবে পরিচালনা করা, যাতে তুরস্কের নিরাপত্তা সরাসরি হুমকির মুখে না পড়ে এবং অঞ্চল দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার মধ্যে না যায়। দ্বিতীয়ত, ইসরায়েলকে সংযত রাখা। বিশেষ করে তুরস্ককে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মোকাবিলা করার প্রবণতা থেকে বিরত রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা প্রয়োজন। গত বসন্তেও ট্রাম্প প্রকাশ্যে নেতানিয়াহুকে তুরস্ক–সংক্রান্ত বিরোধে সংযত থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন।

ইরান ঘিরে সংঘাত যদি আরও বাড়ে, তবে তা যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্কের সম্পর্কে নতুন উত্তেজনা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে ইরানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টা যদি তুরস্কে প্রভাব ফেলে বা তুরস্কবিরোধী কুর্দি গোষ্ঠীর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ে, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে।

এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে সতর্ক কূটনীতি প্রয়োজন। পাশাপাশি দ্রুত সংঘাতের অবসান এবং একটি টেকসই আঞ্চলিক নিরাপত্তাকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগও জরুরি। অন্যথায় এই সংকট মোকাবিলায় ওয়াশিংটন ব্যর্থ হতে পারে।

  • আলপার কোশকুন, ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাংক কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের ইউরোপ প্রোগ্রামের সিনিয়র ফেলো।

    কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

Read full story at source