খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্র কেন বদলে যাবে
· Prothom Alo

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল শনিবার ভোরে ইরানে যে সমন্বিত হামলা চালিয়েছে, তা গত গ্রীষ্মের ১২ দিনের যুদ্ধের পর থেকে দানা বাঁধতে থাকা সংঘাতকে আনুষ্ঠানিকভাবে আবারও জাগিয়ে দিয়েছে।
Visit sport-newz.biz for more information.
হামলায় ইরানের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন কমান্ডারসহ নিহত হয়েছেন ১৯৮৯ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি।
তাঁর মৃত্যুকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘ইতিহাসের অন্যতম খারাপ ব্যক্তি’র অবসান বলে মন্তব্য করেছেন। ট্রাম্পের মতে, এটি শুধু ইরানের জনগণের জন্য নয়, বরং সব মহান আমেরিকানের জন্য ন্যায়বিচার হয়েছে।
এই ভাষ্য থেকেই বোঝা যায়, ওয়াশিংটন এই হামলাকে কেবল সামরিক পদক্ষেপ হিসেবে নয়, বরং আদর্শিক ও কৌশলগত মুহূর্ত হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে।
ইসরায়েল দাবি করেছে, ইসলামি রেভোল্যুশনারি গার্ডের কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপুর, প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহ এবং প্রতিরক্ষা পরিষদের প্রধান অ্যাডমিরাল আলি শামখানিও নিহত হয়েছেন।
এর জবাবে ইরান ইসরায়েল, উপসাগরীয় অঞ্চলে ও ইরাক ও জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি এবং উপসাগরীয় কিছু বেসামরিক স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। পরিস্থিতি দ্রুত বদলাচ্ছে, তবে কোন দিকে যাবে তা এখনো অনিশ্চিত। আঞ্চলিক আকাশসীমা, জ্বালানি স্থাপনা এবং সমুদ্রপথ এখন নতুন করে ঝুঁকির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।
ট্রাম্প এই হামলাকে সীমিত অভিযান হিসেবে নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের এক হুমকিকে চূড়ান্তভাবে ‘নির্মূল’ করার অভিযান হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর দাবি, আগের মার্কিন প্রেসিডেন্টরা সরাসরি এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অনিচ্ছুক ছিলেন। ফলে তিনি নিজের পদক্ষেপকে দৃঢ় নেতৃত্বের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরছেন।
এই সংঘাতে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের জন্য অগ্রাধিকার টিকে থাকা। সামরিক ও রাজনৈতিক সংহতি বজায় রেখে আঘাত সহ্য করা এবং পাল্টা প্রতিক্রিয়া চালিয়ে যাওয়া। ইরান প্রচলিত অর্থে জয়ের জন্য লড়ছে না, বরং শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার জন্য লড়ছে।
এর আগে একটি প্রাথমিক পরমাণু চুক্তির লক্ষ্যে আঞ্চলিক সমর্থন নিয়ে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চলছিল। কিন্তু সেই প্রক্রিয়াকে পরিণত হওয়ার সুযোগ না দিয়ে ট্রাম্প সম্ভবত ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তাঁর প্রশাসনের রক্ষণশীল উপদেষ্টাদের প্রভাবে, ইরানের দুর্বল মুহূর্তে হামলার সিদ্ধান্ত নেন। এতে আলোচনার পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যায় এবং সামরিক সমাধানই প্রধান বিকল্প হিসেবে সামনে আসে।
হামলার পর তিনি বলেন, ইরানের জনগণের এখন নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সময় এসেছে। এতে স্পষ্ট হয় যে ওয়াশিংটন ভেতর থেকে ইরানের শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনকে সমর্থন করছে। ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে ট্রুথ সোশ্যালে লেখেন, এটি ইরানের জনগণের জন্য নিজেদের দেশ ফিরে পাওয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ সুযোগ। এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে ‘শাসন পরিবর্তন’ বিতর্ক উসকে দিয়েছে।
এই সময়টির প্রেক্ষাপট বোঝা জরুরি। এই উত্তেজনা গত দুই বছরের ক্রমবর্ধমান সংঘাতের ফল। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে ইসরায়েল শুধু গাজায় হামাস, উত্তরের সীমান্তে হিজবুল্লাহ এবং লোহিত সাগর সংশ্লিষ্ট হুথি লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে নয়, পরোক্ষভাবে তেহরানের বিরুদ্ধেও ধারাবাহিক সামরিক অভিযান চালিয়েছে।
এসব অভিযানে ইরানের অগ্রবর্তী প্রতিরক্ষা কৌশল দুর্বল হয়েছে এবং সামরিক সক্ষমতা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। এত দিন পর্যন্ত তুলনামূলক অক্ষত ছিল ইরানের নিজস্ব ভূখণ্ড, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং শাসনব্যবস্থার শীর্ষ নেতৃত্ব। এই পর্বে সেই সুরক্ষাবলয় ভেঙে গেছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর এঙ্গেলাব স্কয়ার শোকার্ত মানুষ। ১ মার্চ ২০২৬, তেহরানতবে যুদ্ধ সচরাচর পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোয় না। যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত সামরিক শক্তির সঙ্গে ইরান পাল্লা দিতে না পারলেও দেশটির হাতে রয়েছে অনেকগুলো অসম কৌশল। সংঘাতের ক্ষেত্র বিস্তৃত করে ব্যয়ের বোঝা বাড়িয়ে দেওয়া এবং আঞ্চলিক ঝুঁকি বাড়ানোই ইরানের প্রধান কৌশল। ইসরায়েলি ভূখণ্ড ও উপসাগরীয় মার্কিন স্থাপনায় তাৎক্ষণিক পাল্টা হামলা সেই কৌশলেরই ইঙ্গিত।
প্রতিবেশী উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ভঙ্গুর সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে এটি তেহরানের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে টেকসই যুদ্ধবিরতির জন্য উত্তেজনা বাড়ানোই ইরানের কাছে একমাত্র পথ বলে মনে হচ্ছে।
এই সংঘাতে তিন প্রধান পক্ষের লক্ষ্য ভিন্ন। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের জন্য অগ্রাধিকার টিকে থাকা। সামরিক ও রাজনৈতিক সংহতি বজায় রেখে আঘাত সহ্য করা এবং পাল্টা প্রতিক্রিয়া চালিয়ে যাওয়া। ইরান প্রচলিত অর্থে জয়ের জন্য লড়ছে না, বরং শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার জন্য লড়ছে।
অন্যদিকে ট্রাম্প এমন এক ফল চান, যা প্রমাণ করবে যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের প্রতিপক্ষকে নিষ্ক্রিয় করেছেন। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত বোমাবর্ষণ চলবে। তাঁর কৌশল এই ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে যে অবকাঠামো, কৌশলগত সম্পদ ও শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে ব্যাপক সামরিক শক্তি প্রয়োগ ইরানের কৌশলগত অবস্থান ভেঙে ফেলবে। ইরানকে আত্মসমর্পণ বা ভেতরকার ভাঙনের দিকে ঠেলে দেবে।
ইসরায়েলের লক্ষ্য অনেকাংশে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিললেও দেশটির মনোযোগ কিছুটা আলাদা। নেতানিয়াহু ইরানিদের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের আহ্বান জানালেও ইসরায়েলের মূল উদ্দেশ্য ইরানকে অভ্যন্তরীণ সংকটে ব্যস্ত রাখা এবং কৌশলগতভাবে দুর্বল করে দেওয়া। দীর্ঘ মেয়াদে ইসরায়েল চায় ইরান যেন আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারে আর আগের মতো সক্ষম না থাকে।
ইরান কি মাথা নোয়াবে?প্রথম দিনের বোমাবর্ষণ ও খামেনির মৃত্যুর পর সামনে কয়েকটি সম্ভাব্য পথ দেখা যাচ্ছে। ইরানের উল্লেখযোগ্য ক্ষতি সাধনের পর যুক্তরাষ্ট্র অভিযান থামিয়ে দেখতে পারে, চাপ প্রয়োগে তেহরান ছাড় দেয় কি না। তখন অবশিষ্ট নেতৃত্বকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আংশিক শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে ওয়াশিংটনের দাবি তারা মানবেন কি না।
খামেনির অনুপস্থিতিতে ইরানের শাসন ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভেঙে পড়বে না। সংবিধান অনুযায়ী বিশেষজ্ঞ পরিষদ নতুন সর্বোচ্চ নেতা নিয়োগ করতে পারে। তবে বাস্তবে প্রভাব থাকবে রেভোল্যুশনারি গার্ড ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের হাতে। তারা ক্ষমতার রূপান্তর কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইবে। অন্তর্বর্তীকালীন সমষ্টিগত নেতৃত্বও গড়ে উঠতে পারে, যদিও তা সামরিক চাপের মুখে দুর্বল থাকবে।
দীর্ঘস্থায়ী সামরিক চাপ রাজনৈতিক অভিজাতদের মধ্যে বিভাজনও উন্মোচিত করতে পারে। অর্থনৈতিক সংকট, সামরিক ক্ষতি ও অভ্যন্তরীণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বকে দুর্বল করতে পারে এবং বিরোধী শক্তির জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে। এতে রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে অনিশ্চয়তা আরও বাড়তে পারে।
সবচেয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি হবে নিয়ন্ত্রণহীন ভাঙন। লিবিয়ার অভিজ্ঞতা সতর্কবার্তা হিসেবে সামনে রয়েছে। মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের পর সেখানে রূপান্তরটি শৃঙ্খলাপূর্ণ হয়নি, বরং প্রাতিষ্ঠানিক ভাঙন, সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংঘর্ষ ও বহিরাগত হস্তক্ষেপ দেখা গেছে। ইরান অনেক বেশি জটিল ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী রাষ্ট্র হলেও, সুশৃঙ্খল রাজনৈতিক রূপান্তর ছাড়া শাসনব্যবস্থার শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে দিলে সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থান ও প্রক্সি প্রতিযোগিতার ঝুঁকি থেকে যায়।
এখনই স্পষ্ট যে মধ্যপ্রাচ্য আর আগের অবস্থায় ফিরবে না। উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো, যারা তেহরানের সঙ্গে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করছিল, তারা নতুন ঝুঁকির মুখে পড়েছে। জ্বালানি বাজার ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা, বিশেষত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলো, আরও সংবেদনশীল হয়ে থাকবে। আঞ্চলিক শক্তিগুলো নতুন করে জোট ও প্রতিরক্ষা কৌশল মূল্যায়ন করবে।
ইরান হয়তো এই যুদ্ধ টিকে যাবে, কিন্তু ইসলামি প্রজাতন্ত্র আগের মতো থাকবে না। এই সংঘাতের নির্ণায়ক মুহূর্ত হবে কেবল প্রথম দফার হামলা নয়, বরং টানা সামরিক চাপে যে রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হবে তা। যুক্তরাষ্ট্র তাৎক্ষণিক লক্ষ্য অর্জন করতে পারে। তবে বড় প্রশ্ন হলো, এর পরবর্তী ইরান ও আঞ্চলিক বাস্তবতার জন্য তারা কতটা প্রস্তুত।
সানাম ভাকিল পরিচালক, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচি, চ্যাথাম হাউস
দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত