ইরানিরা দীর্ঘ মেয়াদে বিদেশি শক্তির খবরদারি মেনে নেবে না: অধ্যাপক আবদুল মান্নান

· Prothom Alo

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক মো. আবদুল মান্নান মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ে পর্যালোচনা ও গবেষণা করেন। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের যৌথ হামলা, দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর দেশটির পরিস্থিতি নিয়ে তিনি কথা বলেছেন প্রথম আলোর সঙ্গে। তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন পার্থ শঙ্কর সাহা

Visit forestarrow.rest for more information.

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এ হামলার পর দেশটির বর্তমান অবস্থা কী হতে পারে? ইরান এ হামলার সম্ভাব্য সামরিক প্রতিক্রিয়া কী এবং কতটা দেখাতে পারে বলে আপনার মনে হয়?

অধ্যাপক মান্নান: বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরান হয়তো কিছু প্রতিশোধমূলক হামলা চালাবে। কিন্তু ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক শক্তি মোকাবিলা করার মতো সক্ষমতা তাদের দীর্ঘমেয়াদে আছে বলে মনে হয় না। ইরানের অর্থনৈতিক অবস্থা বর্তমানে অত্যন্ত নাজুক এবং গত জুন মাসে ইসরায়েলের সাথে সংঘাতের সময় তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা) যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে । এসব মিলিয়ে বিশ্বের অত্যন্ত শক্তিশালী দুই সামরিক শক্তিধর দেশকে একা মোকাবিলা করা ইরানের পক্ষে হয়তো সম্ভব হবে না। অন্তত দীর্ঘমেয়াদে হবে না।

ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার কথা শোনা যায়। দেশটির শাসনব্যবস্থার প্রতি মানুষের অভিব্যক্তি কেমন বলে মনে হয়?

অধ্যাপক মান্নান: ইরানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে সেদেশের সাধারণ মানুষের সম্পর্ক অত্যন্ত খারাপ। শাসকগোষ্ঠী বর্তমানে সাধারণ জনগণের কাছ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বলে মনে হয়। এই পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ সমর্থন ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মতো বড় শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধে টিকে থাকা ইরানের জন্য প্রায় অসম্ভব। দীর্ঘকাল ধরে এই শাসনব্যবস্থা আছে। যার সমর্থন অনেকটাই ভঙ্গুর বলে মনে হয়। এখন যুক্তরাষ্ট্র এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট শক্ত অবস্থান নিয়েছেন। তাদের সেই সংকল্পের কাছে ইরান একসময় ভেঙে পড়তে পারে।

ইরানের ওপর এই ভয়াবহ হামলা ভবিষ্যতের ঝুঁকি ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে বলে অনেকেই মনে করছেন। আপনার কী মনে হয়?

অধ্যাপক মান্নান: ইরানের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি অত্যন্ত বিশৃঙ্খল হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সাদ্দাম হোসেনের ইরাক বা গাদ্দাফির লিবিয়ার মতো ইরানও একটি ‘ফেইলড স্টেট’ বা ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে। যদিও ইরানের একটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ সংস্কৃতি এবং দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে, যা একে অন্য দেশগুলোর থেকে আলাদা করে, তবু এর পতন পুরো মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে।

আপনি ইরানের সমৃদ্ধ সংস্কৃতির কথা বললেন। পাশাপাশি তারা কিন্তু জাতীয়তাবাদী। সেই সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবাদের দৃঢ় ভিত্তি আছে। আপনি কী বলবেন?

অধ্যাপক মান্নান: ইরানিরা ঐতিহ্যগতভাবেই প্রচণ্ড জাতীয়তাবাদী। বর্তমান শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়লে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো আফগানিস্তানের হামিদ কারজাইয়ের মতো কাউকে ক্ষমতায় বসানোর চেষ্টা করতে পারে, কিন্তু ইরানিরা দীর্ঘ মেয়াদে বিদেশি শক্তির খবরদারি মেনে নেবে না। তারা বর্তমান শাসকের ধর্মীয় কট্টরপন্থা সমর্থন না করলেও নিজেদের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আপসহীন। তাদের অতীত সেই বাস্তবতার কথাই বলে। তাই আফগানিস্তান বা ইরাকে যেভাবে পুতুল সরকার রাখা গেছে, ইরানে তা নাও সম্ভব হতে পারে।

এই যুদ্ধ কি দীর্ঘমেয়াদি হবে বলে আপনার মনে হয়? এর পরিণতি ও প্রভাব কী হতে পারে?

অধ্যাপক মান্নান: সামরিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো স্বল্প মেয়াদে জয়লাভ করবে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে তারা আফগানিস্তানের মতোই ব্যর্থ হতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ কোনো বড় শক্তির জন্যই লাভজনক হয় না এবং একসময় তা জনসমর্থন হারায়। ফলে সামরিক জয় পেলেও ইরানকে দীর্ঘ মেয়াদে নিয়ন্ত্রণ করা বা সেখানে নিজেদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত কঠিন হবে।

এত বড় হামলা হলো, সেখানে আন্তর্জাতিক বিশ্বের প্রতিক্রিয়াকে আপনি কীভাবে দেখেন?

অধ্যাপক মান্নান: এখানে দেখবেন যে পশ্চিমা প্রায় সব দেশ, যুক্তরাজ্যসহ অনেকেই তো সমর্থন করেছে এই হামলাকে। চীন ও রাশিয়া অনুমিত যে এই হামলাকে অবৈধ বলবে। এই যুদ্ধ অবৈধ, কারণ আন্তর্জাতিক আইনপরিপন্থী। একটি দেশে হামলা করতে গেলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অনুমোদন ও সম্পৃক্ততা লাগে, যা এখানে নেওয়া হয়নি। আইনগতভাবে ইরানকে হামলা করার মতো কোনো যুক্তি দাঁড় করানো কঠিন। পশ্চিমা বিশ্ব এই হামলার পক্ষে থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ইরানের হামলার নিন্দা করেছে।

মধ্যপ্রাচ্যের বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলোর অবস্থান আসলে কতটা পরিষ্কার বলে মনে হয়?

অধ্যাপক মান্নান: আমি মনে করি মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলো আসলে খুশি, কারণ ইরান তাদের কাছে একটা হুমকি। আরব রাষ্ট্রগুলোর কাছে ইরানের সামরিক শক্তি একটি বড় হুমকি। তারা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণের নিন্দা করছে না। বরং ইরান যখন বিভিন্ন দেশের মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে আঘাত করল, তখন তারা তার নিন্দা করেছে। তারা ভেতরে ভেতরে খুশি যে ইরানের সামরিক সক্ষমতা নির্মূল হলে তাদের জন্য ভালো হবে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে সহিংসতা আরও বাড়বে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।

এ যুদ্ধের ফলে মধ্যপ্রাচ্য এবং বৈশ্বিক পরিসরে সহিংসতা বাড়বে বলে মনে হয়?

অধ্যাপক মান্নান: এই ঘটনার পরে মধ্যপ্রাচ্যে সহিংসতা আরও বাড়বে, তবে এটি পুরো বিশ্বে ছড়াবে কি না তা নিশ্চিত নয়। ইরান যদি অস্থিতিশীল হয়, তবে পুরো অঞ্চল অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে এবং সাপ্লাই চেইন হুমকির মুখে পড়বে। এর ফলে হামাস বা হুতিদের মতো ইরান–সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো দুর্বল হয়ে পড়বে, কারণ তারা সব সময় ইরানের সমর্থন পেয়ে আসছে।

এই সমস্যাটি মূলত ওই অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকবে বলে মনে হয়। যদি রাশিয়া বা চীন ইরানকে উদ্ধার করতে এগিয়ে আসত, তবে এটি বৈশ্বিক রূপ নিতে পারত। কিন্তু আমার মনে হয় না রাশিয়া বা চীন সরাসরি ইরানকে উদ্ধার করতে এগিয়ে আসবে, কারণ চীনের এখনো সেই সক্ষমতা নেই যে তারা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের মোকাবিলা করবে। চীন খুবই ক্যালকুলেটেড গেম খেলে এবং তারা সামরিকভাবে ইরানকে সমর্থন করার পর্যায়ে এখনো যায়নি।

এই যুদ্ধের ফলে ইরান পরাজিত হলে দীর্ঘ মেয়াদে বৃহত্তর ইসরায়েল গঠনের যে চেষ্টা সেটা সফল হতে পারে। ইতিমধ্যে হিজবুল্লাহ ও হামাসকে প্রায় নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান পরাজিত হলে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কোনো শক্তি সেখানে রইল না। ইসরায়েল এবার সফল হলে তাদের পরবর্তী লক্ষ্যবস্তু হতে পারে তুরস্ক। এই শঙ্কাও অমূলক নয়।

ইরান কিন্তু পরমাণু শক্তিধর দেশ, সে ক্ষেত্রে এটা ঝুঁকিপূর্ণ কি না এ রকম একটা দেশ অস্থিতীশীল হলে?

অধ্যাপক মান্নান: ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে সুস্পষ্ট কোনো প্রমাণ নেই। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শক্তিশালী গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, ইরান এখনো পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে পারেনি। তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি কয়েক বছর পিছিয়ে গিয়েছে বলে জানা গেছে। এখনো পর্যন্ত ইরান এই অস্ত্রটি অর্জন করেছে এমন কোনো তথ্যপ্রমাণ নেই। তারা পারমাণবিক শক্তি হয়তো অন্য কাজে ব্যবহার করছে, কিন্তু অস্ত্র তৈরির কোনো অকাট্য প্রমাণ নেই।

Read full story at source