আপনি কি সম্পর্কে জড়ানোর জন্য প্রস্তুত? উত্তর মিলিয়ে নিন

· Prothom Alo

সময় বদলালে ভালোবাসার ধরনও বদলে যায়। শুরুতে উত্তেজনা ভালো লাগে, পরে স্থিতিশীলতা গুরুত্বপূর্ণ হয়।

অনেকেই মনে করেন, একটি সম্পর্কের সাফল্য নির্ভর করে ‘সঠিক মানুষ’ খুঁজে পাওয়ার ওপর। কিন্তু মনোবৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে ভিন্ন কথা। অনেক সম্পর্ক ভেঙে যায় ভুল মানুষ বেছে নেওয়ার কারণে নয়, বরং আমরা মানসিকভাবে প্রস্তুত না হয়েও যখন কোনো সম্পর্কে জড়িয়ে যাই। তাই সম্পর্কে জড়ানোর আগে নিজেকে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করা জরুরি।

১. অ্যাটাচমেন্টকে আমি কি নিরাপদ মনে করছি
অ্যাটাচমেন্ট তত্ত্ব প্রথম দেন জন বোলবি। পরবর্তী সময়ে মেরি এইনসওয়ার্থ তা নিয়ে আরও গবেষণা করেন। এই তত্ত্ব বলছে, শৈশবে মা–বাবা বা অভিভাবকের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কেমন ছিল, সেটির ওপর নির্ভর করে বড় হয়ে প্রেম বা দাম্পত্য সম্পর্কে আমাদের আচরণ কেমন হবে। অর্থাৎ শৈশবের সম্পর্ক প্রভাব ফেলে।

Visit amunra.qpon for more information.

যদি ছোটবেলায় মা–বাবা বা অভিভাবকের সঙ্গে সম্পর্কে সন্তান যত্ন ও নিরাপত্তা পায়, তাহলে তার মনে এই বিশ্বাস জন্মায় যে—মানুষ ভরসাযোগ্য, সম্পর্ক নিরাপদ। আর যদি যত্ন অনিয়মিত, অবহেলাপূর্ণ বা ভীতিকর হয়, তাহলে সম্পর্ক নিয়ে ভিন্ন ধারণা তৈরি হয়।

গবেষকেরা সাধারণত দুইভাবে বিষয়টিকে দেখেন:
অ্যাটাচমেন্ট অ্যানজাইটি বা ছেড়ে যাওয়ার ভয়
অ্যাটাচমেন্ট অ্যাভয়ডেন্স বা সম্পর্কে ঘনিষ্ঠতায় অস্বস্তি

এ থেকে আবার চার ধরনের আচরণ দেখা যায়:

• নিরাপদ: কম ভয়, কম এড়িয়ে চলা। এ ধরনের মানুষেরা নিজের চাহিদা স্পষ্টভাবে বলে, সম্মান আশা করে, সীমা লঙ্ঘন হলে সম্পর্ক ছাড়তে পারে এবং স্বাধীনতা বজায় রেখেও ভালোবাসতে পারে। এদের সঙ্গে সম্পর্ক সাধারণত স্থিতিশীল হয়।
• উদ্বিগ্ন: বেশি ভয়, কম এড়িয়ে চলা। এ ধরনের মানুষেরা সব সময় নিশ্চয়তা চায়, দ্রুত ঘনিষ্ঠ হতে চায় এবং যোগাযোগ কমলে ভয় পায়। কখনো কখনো তাদের আচরণ সঙ্গীকে দূরে ঠেলে দেয়।
• এড়িয়ে চলা: কম ভয়, বেশি দূরত্ব। এ ধরনের মানুষেরা আবেগ প্রকাশে অস্বস্তি বোধ করে, খুব স্বাধীন থাকতে চায় এবং ঘনিষ্ঠতা এড়িয়ে চলে। ফলে সঙ্গী নিজেকে দূরে ঠেলে দেওয়া মনে করতে পারে।
• ভীত-দ্বিধাগ্রস্ত: বেশি ভয়, বেশি দূরত্ব। এ ধরনের মানুষেরা ঘনিষ্ঠতা চায়, কিন্তু একই সঙ্গে ভয়ও পায়। সম্পর্ক তাদের কাছে জটিল ও অস্থির মনে হয়।

ভালোবাসা মানে দখল নয়, দায়বদ্ধতা

তবে এই আচরণগুলো স্থায়ী নয়। সচেতনতার চর্চা ও কাজের মাধ্যমে তা পরিবর্তন সম্ভব। তাই নিজেকে জিজ্ঞেস করুন:
আমি কি নিজের মনের কথা সরাসরি বলি নাকি সঙ্গী বুঝে নেবে বলে আশা করি?
যোগাযোগ কমে গেলে কি আমি আতঙ্কিত হই?
কেউ কাছে এলে কি আমি দূরে সরে যাই?
সম্পর্ক আমাকে শান্ত করে নাকি অস্থির করে তোলে?

২. আমি কি সম্পর্ক চাই নাকি আশ্রয় খুঁজছি?
ভালোবাসা থেরাপি নয়। আবার সঙ্গী কোনো ‘সমস্যা সমাধানের কেন্দ্র’ নয়। যদি আপনার মধ্যে ট্রমা, দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ, হতাশা, আসক্তি বা অমীমাংসিত কষ্ট থাকে, তাহলে আগে পেশাদার কোনো বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া জরুরি। গবেষণা বলছে, থেরাপিতে সফলতার সবচেয়ে বড় কারণ হলো থেরাপিস্টের সঙ্গে বিশ্বাসভিত্তিক সম্পর্ক।

মনে রাখবেন, আপনার সঙ্গীর কাজ আপনাকে সুস্থ করা নয়। আপনার কাজও সঙ্গীকে বদলে দেওয়া নয়। সুস্থ সম্পর্ক তখনই হয়, যখন দুজনই নিজের দায়িত্ব নিজে নিতে পারে।

৩. আমি কি সত্যিই এই সময়টায় সম্পর্কের জন্য প্রস্তুত
কখনো মানুষ সমস্যা হয় না, সমস্যা হলো সময়। কৈশোর ও তরুণ বয়সে আমরা নিজের পরিচয় গড়ে তুলি—‘আমি কে’, ‘আমি কী চাই?’

এই সময় কাউকে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি দিলে তা ব্যক্তিগত বিকাশে বাধা হতে পারে। কারণ, দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক তখনই ভালো হবে, যখন আপনি নিজেকে ভালোভাবে চিনতে পারবেন।

সাধারণত মানুষ এমন সঙ্গী বেছে নেয়, যার মানসিক, সামাজিক ও ব্যক্তিগত মূল্য তার সঙ্গে মিলে বা কাছাকাছি হয়। যদি বারবার অস্বাস্থ্যকর সম্পর্কে জড়ান, নিজেকে প্রশ্ন করুন, ‘আমি সম্পর্কে নিজের কোন সংস্করণ নিয়ে যাচ্ছি?’

শুধু আবেগই যথেষ্ট নয়
মনোবিজ্ঞানীরা দুই ধরনের ভালোবাসার কথা বলেন।

• উত্তেজনাপূর্ণ ভালোবাসা: এতে থাকে উচ্ছ্বাস, অতিরিক্ত ভাবনা, ঘুম না হওয়া, আবেগের ওঠানামা। এটি মস্তিষ্কের আনন্দ দেওয়ার হরমোনকে সক্রিয় করে, যা খুব আনন্দ দেয়, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী নয়।
• সাহচর্যভিত্তিক ভালোবাসা: এতে থাকে বন্ধুত্ব, নিরাপত্তা, পারস্পরিক সম্মান, মিলেমিশে সমস্যা সমাধান। দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের ভিত্তি এটি।

অনেকে বলেন, শুরুতে কেবল আবেগের বশবর্তী হয়ে বিয়ে করা ঠিক নয়। সময় বদলালে ভালোবাসার ধরনও বদলে যায়। শুরুতে উত্তেজনা ভালো লাগে, পরে স্থিতিশীলতা গুরুত্বপূর্ণ হয়।

আপনি কি সম্পর্কের জন্য প্রস্তুত
যদি—
অ্যাটাচমেন্ট নিয়ে আপনার মধ্যে সংকোচ থাকে
মানসিকভাবে সম্পর্কজনিত কোনো একটি ঘটনা অমীমাংসিত থাকে
এখনো নিজের ক্যারিয়ার ও পরিচয় গড়ছেন
শুধু আবেগ খুঁজছেন
তাহলে বুঝে নেবেন সম্পর্কে জড়ানোর জন্য আপনি এখনো প্রস্তুত নন।

আর যদি—
সঙ্গীকে সংকোচহীনভাবে ভালোবাসতে পারেন
নিজের পরিচয় ও ক্যারিয়ার নিয়ে পরিষ্কার ধারণা রয়েছে
বন্ধুত্ব ও স্থিতিশীলতাকে গুরুত্ব দেন
তাহলে বুঝে নেবেন সম্পর্কে জড়ানোর জন্য আপনি প্রস্তুত।

মনে রাখবেন, কথিত সঠিক মানুষ খুঁজে পেলেই সুস্থ সম্পর্ক তৈরি হয় না। এটা তখনই হয়, যখন দুজন মানুষ মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়ে আসে—নিজেকে সামলাতে পারে, স্পষ্টভাবে কথা বলতে পারে এবং আবেগ বাদ দিয়ে স্থিতিশীল কিছু গড়তে চায়। তাই প্রশ্ন হবে, আপনি কি ভালোবাসার সম্পর্কে জড়ানোর জন্য নিজেকে প্রস্তুত মনে করছেন?

সূত্র: সাইকোলজি টুডে

Read full story at source