অন্ত্রের সুরক্ষায় প্রোবায়োটিক: রোজায় খাবারের নতুন সমীকরণ
· Prothom Alo

রমজান মাসে খাদ্যাভ্যাস ও খাবারের সময়ের আমূল পরিবর্তনের ফলে আমাদের অন্ত্র বা ‘গাট মাইক্রোবায়োম’-এর ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়ে। দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকা এবং ইফতার ও সাহ্রিতে ভারী খাবারের চাপে অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য বজায় রাখা চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়ায়। এই ভারসাম্য রক্ষায় ‘প্রোবায়োটিক’ বা জীবন্ত উপকারী ব্যাকটেরিয়া হতে পারে একটি বৈজ্ঞানিক ও কার্যকর সমাধান।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
রমজানে দীর্ঘ সময় উপবাস থাকার ফলে আমাদের পরিপাকতন্ত্র একটি ‘ডিটক্স’ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। তবে ইফতারের পর অধিক শর্করা, ভাজাপোড়া ও চিনিযুক্ত খাবারের আধিক্য অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়া বা গাট ফ্লোরার ভারসাম্য নষ্ট করে। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে অন্ত্রকে বলা হয় শরীরের ‘দ্বিতীয় মস্তিষ্ক’। আর এই অন্ত্রকে সচল ও সুস্থ রাখতে প্রোবায়োটিকের ভূমিকা এখন গবেষণালব্ধ সত্য।
আমাদের অন্ত্রে ট্রিলিয়ন পরিমাণ ব্যাকটেরিয়া বাস করে। এদের মধ্যে বন্ধু ব্যাকটেরিয়া ও ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার অনুপাত ঠিক থাকা জরুরি। আসুন আগে জেনে নিই এসব ব্যাকটেরিয়া আমাদের কী উপকার করে।
গাট ব্যারিয়ার রক্ষা: দীর্ঘ উপবাসের পর ইফতারে যখন হঠাৎ ভারী খাবার পড়ে, তখন অন্ত্রের দেয়ালে চাপের সৃষ্টি হয়। প্রোবায়োটিক তখন অন্ত্রের দেয়ালে একটি প্রতিরক্ষামূলক স্তর তৈরি করে, যা ক্ষতিকর টক্সিন রক্তে মিশতে বাধা দেয়।
শর্ট-চেইন ফ্যাটি অ্যাসিড উৎপাদন: প্রোবায়োটিক অন্ত্রে বিউটিরেট নামের উপাদান তৈরি করে, যা কোলনের কোষগুলোয় শক্তি জোগায় এবং প্রদাহ কমায়।
হজমপ্রক্রিয়া সচল রাখা
রমজানের সাধারণ সমস্যা, যেমন গ্যাস, পেট ফাঁপা বা কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে প্রোবায়োটিক এনজাইম নিঃসরণে সাহায্য করে।
আন্তর্জাতিক জার্নাল নিউট্রিয়েন্টস–এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, রমজানের সময় নিয়মিত প্রোবায়োটিকসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণকারীদের মধ্যে পরিপাকজনিত জটিলতা অন্তত ৩৫ শতাংশ কম পরিলক্ষিত হয়।
ফাহমিদা হাশেমবাংলাদেশের একটি বেসরকারি হেলথ ফাউন্ডেশনের জরিপে দেখা গেছে, যাঁরা ইফতারে নিয়মিত টক দই বা প্রোবায়োটিক পানীয় গ্রহণ করেন, তাঁদের মধ্যে রমজানের শেষার্ধে ক্লান্তি ও অ্যাসিডিটির হার অন্যদের তুলনায় অনেক কম। এ ছাড়া অ্যাডভান্স রিসার্চ বলছে, প্রোবায়োটিক শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বা ইমিউন সিস্টেমের ৭০-৮০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে, যা দীর্ঘ রোজার ক্লান্তি মোকাবিলায় সহায়ক।
তাই ইফতার ও সাহ্রিতে প্রোবায়োটিকের সঠিক সমন্বয় করা খুব জরুরি।
ইফতারের শুরুতে ভাজাপোড়া খাওয়ার আগে প্রোবায়োটিক গ্রহণ করা সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। যেমন—
টক দই ও লাচ্ছি: চিনি ছাড়া টক দই বা পাতলা লাচ্ছি অন্ত্রের অ্যাসিডিটিকে প্রশমিত করে। ইফতারে শরবত না খেয়ে পান করতে পারেন চিনিবিহীন এক গ্লাস লাচ্ছি।
ঘোল: দেশীয় ঘোল প্রোবায়োটিকের চমৎকার উৎস। এটি ইলেকট্রোলাইটের ব্যালান্স ঠিক রাখে।
আবার সাহ্রির শেষ দিকে প্রোবায়োটিক গ্রহণ করলে সারা দিন অন্ত্র শান্ত থাকে। যেমন—
ফল ও টক দইয়ের মিশ্রণ: কলা বা আপেলের সঙ্গে টক দই মিশিয়ে খেলে ‘প্রোবায়োটিক’ ও ‘প্রিবায়োটিক’-এর সমন্বয় তৈরি হয়, যা দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখে এবং হজম সহজ করে।
পান্তা ভাত: যদিও এটি ঐতিহ্যগত, তবে বৈজ্ঞানিকভাবে পান্তা ভাতে প্রচুর ল্যাকটোব্যাসিলাস থাকে, যা অন্ত্রের জন্য মহৌষধ। তাই যাঁদের হজমজনিত সমস্যা বেশি, তাঁরা সাহ্রিতে পান্তাভাত রাখার চেষ্টা করুন।
শুধু প্রোবায়োটিক খেলেই হবে না, তাদেরও খাবার দিতে হবে। এই খাবারকে বলা হয় প্রিবায়োটিক।
সেরা প্রিবায়োটিক খাবার
প্রিবায়োটিক খাবারের মধ্যে রয়েছে রসুন, পেঁয়াজ, কলা, ওটস ও ডাল। ইফতারের মেনুতে এসব আঁশসমৃদ্ধ খাবার রাখলে প্রোবায়োটিকগুলো অন্ত্রে বেশি সময় টিকে থাকতে পারে।
রমজানে বাজারের প্যাকেটজাত মিষ্টি দইয়ের চেয়ে ঘরে পাতা টক দই বেছে নেওয়া উত্তম। যাঁদের দুগ্ধজাত খাবারে সমস্যা আছে, তাঁরা প্রয়োজনে স্বাস্থ্য বা পুষ্টিবিশেষজ্ঞের পরামর্শে প্রোবায়োটিক সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করতে পারেন।
ফাহমিদা হাশেম: সিনিয়র ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশনিস্ট, ল্যাবএইড