রমজানের আতিথেয়তায় প্রবীণদের কদর করার রীতি
· Prothom Alo

রমজানের ইফতার মানেই কেবল সুস্বাদু খাবারের আয়োজন নয়, বরং এটি আত্মীয়তার বন্ধন দৃঢ় করার এক অনন্য মুহূর্ত। এই আড্ডায় ঘরের বড়রা—দাদা-দাদি, নানা-নানি কিংবা প্রবীণ আত্মীয়রা যখন উপস্থিত থাকেন, তখন বাড়ির পরিবেশ এক পবিত্র বরকতে ভরে ওঠে।
তবে প্রবীণদের মেহমানদারিতে কেবল ঐতিহ্যবাহী আপ্যায়নই যথেষ্ট নয়; বরং তাঁদের বয়স, শারীরিক অবস্থা এবং মানসিক সংবেদনশীলতার প্রতি বিশেষ যত্নশীল হওয়া প্রয়োজন। আধুনিক শিষ্টাচারের ভাষায় প্রবীণদের সাথে এই বিশেষ আচরণকে বলা হয় ‘স্মার্ট হসপিটালিটি’।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
বসার স্থান নির্বাচনে সতর্কতা
একজন প্রবীণের ইফতারির অভিজ্ঞতা শুরু হয় বাড়ির ভেতরে তাঁর বসার স্থানটি থেকে। তাঁদের জন্য এমন একটি আসন নির্বাচন করা উচিত যা একই সাথে আরামদায়ক এবং নিরাপদ।
আসনের উচ্চতা ও দৃঢ়তা: খুব বেশি নরম বা নিচু সোফায় বসলে প্রবীণদের জোড়ায় ব্যথা হতে পারে এবং সেখান থেকে একা ওঠা তাঁদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তাই কিছুটা উঁচু এবং শক্ত কুশনযুক্ত চেয়ার বা সোফা তাঁদের জন্য বেশি উপযোগী।
আবহাওয়ার ভারসাম্য: খেয়াল রাখতে হবে যেন প্রবীণ মেহমানের আসনটি এসির ঠিক নিচে বা খুব কাছাকাছি না হয়। হাড়ের ব্যথার কারণে তাঁরা সরাসরি ঠান্ডা বাতাস সহ্য করতে পারেন না।
সহায়ক টেবিল: তাঁদের আসনের পাশে একটি ছোট সাইড টেবিল রাখা উচিত। যেখানে তাঁরা চশমা, মোবাইল, ওষুধের বক্স বা তসবি রাখতে পারেন। এতে তাঁদের বারবার নিচু হতে হবে না, যা তাঁদের আত্মমর্যাদা ও স্বাচ্ছন্দ্যবোধ বাড়ায়।
ইফতারের আগের সময়টুকু
মাগরিবের আজানের ঠিক আগের সময়টুকু রোজাদার প্রবীণদের জন্য বেশ ক্লান্তিকর হতে পারে। এই সময়টিকে আনন্দদায়ক করতে কিছু কৌশল অবলম্বন করা যেতে পারে।
স্মৃতির জানালা: প্রবীণদের সামনে পুরনো পারিবারিক স্মৃতিচারণ করা যেতে পারে। এটি তাঁদের শৈশব বা যৌবনের স্মৃতিকে জাগ্রত করে এবং তাঁদের একঘেয়েমি দূর করে।
আধ্যাত্মিক পরিবেশ: অনেক প্রবীণই টেলিভিশনের কোলাহলের চেয়ে রেডিওতে কোরআন তেলাওয়াত বা ধীরলয়ের ইসলামি সংগীত (নাশিদ) শুনতে পছন্দ করেন। বাড়ির এক কোণে তাঁদের জন্য নামাজের পাটি ও বড় হরফের একটি কোরআন শরিফ প্রস্তুত রাখা একটি সূক্ষ্ম শিষ্টাচার।
আলাপচারিতার শিষ্টাচার
বর্তমানে তরুণ প্রজন্মের আড্ডায় স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের পরিভাষাগুলোই প্রধান হয়ে ওঠে। এতে প্রবীণরা অনেক সময় নিজেকে একা বা বিচ্ছিন্ন মনে করেন।
সংলাপের সমন্বয়কারী: বাড়ির কর্তার দায়িত্ব হলো আড্ডায় প্রবীণদের যুক্ত রাখা। যদি কোনো নতুন প্রযুক্তি বা ট্রেন্ড নিয়ে কথা হয়, তবে তা সহজ ভাষায় তাঁদের বুঝিয়ে বলুন এবং তাঁদের মতামত জানতে চান।
গল্পের সুযোগ দেওয়া: তাঁদের কেবল শ্রোতা বানিয়ে না রেখে বক্তা হওয়ার সুযোগ দিন। “দাদা, আপনার সময়কার সবথেকে কঠিন রোজাটি কেমন ছিল?”—এই ধরনের প্রশ্ন তাঁদের মনোযোগের কেন্দ্রে নিয়ে আসে।
ফোন ব্যবহারের সতর্কতা: বড়রা যখন কথা বলেন, তখন মোবাইল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা একটি নীরব অবমাননা। প্রবীণদের উপস্থিতিতে স্মার্টফোন পকেটে রাখাই আদব। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, “সে ব্যক্তি আমাদের দলের অন্তর্ভুক্ত নয়, যে আমাদের বড়দের সম্মান করে না এবং ছোটদের স্নেহ করে না।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৯১৯)
স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ দস্তরখান
আপ্যায়নের আসল পরীক্ষা হলো খাবারের টেবিলে। এখানে কেবল স্বাদ নয়, স্বাস্থ্যের নিরাপত্তাই বড় কথা।
লবণের বিকল্প: উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের জন্য খাবারে লবণের পরিমাণ কমিয়ে লেবু, পুদিনা বা হালকা গোলমরিচ ব্যবহার করা যেতে পারে।
মিষ্টির সচেতনতা: অতিরিক্ত সিরা বা চিনির মিষ্টির বদলে ওভেনে বেক করা পিঠা বা সামান্য মধুযুক্ত ফল পরিবেশন করা ভালো।
বিশেষ পানীয়: তাঁদের জন্য চিনিমুক্ত লেবুর শরবত বা ভেষজ চা রাখা যেতে পারে। সবচেয়ে বড় শিষ্টাচার হলো এই স্বাস্থ্যকর খাবারগুলো কেবল তাঁদের জন্য আলাদা না রেখে সবার জন্যই পরিবেশন করা, যাতে তাঁরা নিজেদের ‘রোগী’ মনে না করেন।
বিদায় দেওয়ার সময়
বিদায় দেওয়ার ভঙ্গিটি ইফতারের আয়োজনের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রবীণরা শারীরিক ক্লান্তির কারণে বেশিক্ষণ আড্ডা দিতে পারেন না। তাই ইফতার ও নামাজের পর তাঁদের চোখের ভাষা বুঝে সভার ইতি টানা উচিত।
তাঁদের সসম্মানে ঘর পর্যন্ত বা গাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া এবং হাতে হাত রেখে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা একটি সুন্দর সমাপনী। আপনার একটি মৃদু স্পর্শ বা হাসিমুখ তাঁদের মনে যে প্রশান্তি দেবে, তার রেশ থাকবে পরবর্তী অনেক দিন।
জীবনের গোলকধাঁধায় নিয়ত যখন পথপ্রদর্শক